সাম্প্রতিক লেখাসমূহ
- লিঙ্ক পান
- X
- ইমেল
- অন্যান্য অ্যাপ
আমাদের ব্যক্তিত্বের কোন দিক পরিবর্তন করা সবচেয়ে কঠিন? - শাওন সিকদার
জাপানের হিরোশিমা শহরে যখন আমেরিকা 'লিটল বয়' নামক পারমানবিক বোমা হামলা করে, তখন মোটামুটি ৮০ হাজার মানুষ শুধু হিরোশিমা শহরেই মারা যায়। মারা যাওয়া এই ৮০ হাজার মানুষের মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ ছিলো জাপানের সাধারণ জনগন, যাদের সাথে বিশ্বযুদ্ধের কোন লেনাদেনা ছিলো না, নিত্যান্তই সাধারণ মানুষ যারা প্রতিদিনের মতো তাদের সাধারণ জীবন যাপন করছিলো। ৬ আগষ্ট ১৯৪৫ এর সেই সকালের কথা জাপানের জনগন হয়তো কোনদিন ভুলতে পারবে না। গরমের মৌসুম, নীল আকাশ, রৌদ্দ্রজ্জল সকাল, সবাই নিজ নিজ ব্যেক্তিগত জীবন নিয়ে ব্যাস্ত। সকাল প্রায় ৮ টার আশেপাশের সময় আকাশে আমেরিকার Boing B-29 বিমান দেখা যায়, আর ঠিক ৮ টা ১৫ মিনিটের সময় ছোট্ট কিছু একটা আকাশ থেকে পড়ে মাটিতে। আশেপাশে থাকা সাধারণ জনগন হয়তো কোনদিন ভাবতেও পারেনি আকাশ থেকে পড়া 'লিটল বয়' নামের এই ছোট কিছু একটাই হতে যাচ্ছে তাদের জীবনে দেখা শেষ কিছু! মাটিতে পড়ার সাথে সাথেই বিশালকার আগুনের গোলার সৃষ্টি হয়, মুহূর্তের মধ্যেই আশেপাশের তাপমাত্রা ৪০০০ ডিগ্রী সেলসিয়াসে চলে আসে, মাত্র ৪৩ সেকেন্ডের মাথায় সবকিছু শেষ হয়ে যায়। নিমিষেই ৮০ হাজার মানুষের জীবনের সমাপ্তি ঘটে। সেদিনের বোমা হামলায় বেচে যাওয়া মানুষদের জীবনের করুন কাহিনী আমরা খুব কমই জানি। বোমা হামলার তীব্র আলোতে বহু মানুষ ক্ষনিকের জন্য অন্ধ হয়ে গিয়েছিলো, প্রচন্ড শব্দে বহু মানুষ পারমানেন্ট ভাবে কানে শোনার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, ৪০০০ ডিগ্রী সেলসিয়ায় তাপমাত্রায় আশেপাশে থাকা বহুমানুষ যায়গায় বাষ্পীভূত হয়ে মিলিয়ে গেছে, শহরের ৭০% স্ট্রাকচার মাত্র ১৫ মিনিটে শেষ হয়ে যায়। ১৫ মিনিট আগেও হয়তো কোন এক বাচ্চা তার বাবা মায়ের হাত ধরে স্কুলে যাচ্ছিলো, কিংবা কোন এক দোকানি প্রতিদিনের মতো এসে দোকান খুলেছিলো, সবকিছুই ঠিকঠাক ছিলো। মাত্র ১৫ মিনিট পরেই সেই বাচ্চা হয়তো তার বাবা মায়ের সাথে বাষ্পীভূত হয়ে মিলিয়ে গিয়েছে হাওয়ায়, সেই দোকানি হয়তো কখনো বুঝতেই পারেনি সেটাই তার জীবনের শেষদিন ছিলো।
আপনাকে যদি বলি এমনটা হওয়া আটকানো সম্ভব ছিলো, তাহলে বিশ্বাস করবেন? আমেরিকান প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান আর তার এলাইস টিমের পক্ষ থেকে জাপানকে বলা হয়েছিলো, আনকন্ডিশনাল সারেন্ডার করার জন্য, একই সাথে দেওয়া হয়েছিলো ওয়ার্নিং। যদি জাপান আত্মসমর্পন না করে তাহলে তার একমাত্র ফলাফল হবে 'কমপ্লিট ডিসট্রাকশন'। কিন্ত জাপানের শাসক হিরোহিতো, তার বিশ্বাস ছিলো ভিন্ন। তার স্বপ্ন ছিলো 'গ্রেটার এশিয়ার', তার দখল করা সমস্ত দেশ তার দখলে থাকবে এমন শর্তে হয়তো সে সারেন্ডার করতো, কিন্ত আমেরিকার আনকন্ডিশনাল সারেন্ডার তার পছন্দমতো হলো না, সে সারেন্ডার ও করলো না। তার মূল্য চুকাতে হলো ৮০ হাজার মানুষকে তাদের জীবন দিয়ে।
৮০ হাজার মানুষের জীবন যাওয়ার পরেও হিরোহিতোর বোধ হয়নি তার এবার সারেন্ডার করা উচিৎ। সে তার গ্রেটার এশিয়ার স্বপ্নে তখনো বিভোর ছিলো, জাপানিজ জাতির শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কিত তার ভাবনা তখনো অটুট ছিলো। এই পারমানবিক হামলার পরেও তার বক্তব্য ছিলো খানিকটা এমন যে, " এটা আর এমনকি বড় ব্যাপার, একটা বোমা হামলাই তো করেছে। সারেন্ডার করার প্রশ্নেই আশে না।"
তার এই নির্বোধ সিদ্ধান্তের কারণে 'ফ্যাট ম্যান' বোমা দিয়ে ধংশ হয় আরো একটি শহর নাগাসাকি। মূল্য চুকাতে হয় নাগাসিকি শহরের আরো ৪০,০০০ মানুষকে তাদের জীবন দিয়ে।
জাপানিজ শাসক হিরোহিতো যদি প্রথমেই সারেন্ডার করে দিতো, তাহলে হয়তো তাদেরকে আমেরিকার ম্যানহ্যাটান প্রজেক্টের প্রথম শিকার হতে হতো না। হিরোশিমা নাগাসিকি শহরের দুই লক্ষ মানুষের জীবন যেতো না। ৬ আগষ্ট সকালবেলা বাবা মায়ের সাথে স্কুলে যাওয়া সেই মেয়েটা স্বাভাবিক ভাবেই বাড়িতে ফেরত আসতো। হিরোহিতোর একটা সিদ্ধান্ত এতগুলো মানুষের জীবন বদলে দিলো।
এইখানে আমাদের মনে প্রশ্ন আসে যে, কী এমন আছে গ্রেটার এশিয়ায় যে যার মূল্য চুকাতে হলো দুই লক্ষ মানুষকে তাদের জীবন দিয়ে! কী এমন আছে এই গ্রেটার এশিয়ায় যার জন্য এত মানুষের জীবন যাওয়ার পরেও হিরোহিতোর হুশ হয়নি তার সারেন্ডার করা উচিৎ। এটার উত্তর হলো কিছুই না। কিছুই নেই গ্রেটার এশিয়ায়, তাহলে এতকিছু কেন?
আপনি যখন আরবে যাবেন তখন দেখবেন তারা নিজেদেরকে দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে বিবেচনা করে, ইউরোপিয়ান দের থেকে নিজেদেরকে উচু জাতের ভাবে। কিন্ত আপনি যখন ইউরোপে যাবেন তখন দেখবেন ব্যাপারটা উল্টো, ইউরোপের মানুষদের আরবদের পাত্তা দেওয়ার সময়ই নেই, তারাই দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ জাতি। কিন্ত আপনি যখন ভারতে আসবেন দেখবেন ব্যাপারটা আরো গোলমেলে, আরব আর ইউরোপিয়ান এরা কেউই দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ জাতি না, ভারতীয়রাই দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ জাতি। আপনি হয়তো ভারতে বসে ভাবছেন আপনার দেশ বা জাতি সবচেয়ে সেরা, কিন্ত বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তানে আরো বহু মানুষ ভেবে বসে আছে যে তারাই দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ জাতি, বাকিরা নিচু জাতের। মানুষ বলুন, দেশ বলুন, ধর্ম বলুন, জাতি বলুন সবার মাঝেই এক ধরনের প্রবনতা থাকে, আরো ক্লিয়ার করে বললে, সবার বিশ্বাস থাকে তারাই দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ জাতি।
আমেরিকার টুইন টাওয়ার, পেন্টাগনে কেন ওসামা বিন লাদেন হামলা করেছে বলুন তো? যেসব মানুষ লাদেনের হয়ে এসব সুইসাইড মিশনে অংশ নিয়ে সেচ্ছায় নিজের জীবন দিলো, প্রশ্ন হচ্ছে কেন দিলো? এখন আমরা লাদেন নাম শুনলেই মাথায় আসে এক ভয়ানক ব্যেক্তিত্বের অবয়ব, কিন্ত প্রশ্ন হচ্ছে লাদেন তো আপনার আমার মতো সাধারণ একজন মানুষ হয়ে জন্ম নিয়েছিলো, তাহলে কী এমন জিনিস যা তাকে এমন ভয়ানক বানায়? উত্তর হচ্ছে লাদেনের বিশ্বাস। লাদেনের বিশ্বাস ছিলো, মুসলমানরা দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ জাতি, আমেরিকার উচিৎ একটা শিক্ষা পাওয়া যে মুসলমানদের সাথে পাঙ্গা নেওয়ার ফলাফল কী হতে পারে। যেমনটা ছিলো জাপানিজ শাসক হিরোহিতোর বিশ্বাস, জাপানিজ জাতির শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে, গ্রেটার এশিয়া নিয়ে। আপনি ভারতে গেলে দেখবেন একদল কট্টরপন্থী হিন্দু যারা ভাবে হিন্দুরাই সেরা, ইসরাইলে গেলে দেখবেন একদল কট্টরপন্থী ইহুদী যাদের মতে ইহুদিরাই সেরা, গাজা উপত্যকা কিংবা আফগানিস্তানে গেলে দেখবেন একদল কট্টরপন্থী মুসলমান যাদের মতে মুসলমানরাই সেরা, এইরকম বিশ্বাস রাখা প্রতিটা মানুষই ওসামা বিন লাদেন, আলবেনিয়ার হোজ্জা, জার্মানির হিটলার কিংবা জাপানের হিরোহিতোর মতো ভয়ানক।
একজন মানুষের জীবনের প্রতিটি ছোটখাটো বিশ্বাস একজন মানুষকে শেপ দেয় যে সে মানুষ হিসেবে কেমন হবে, যাকে আমরা ব্যেক্তিত্ব বলি। আর মানুষের এসব ছোটখাটো বিশ্বাস পরিবর্তন করাই হয়তো দুনিয়ার সবচেয়ে কঠিন কাজ। যে মানুষ বিশ্বাস করে ঘুমের মাঝে বোবা জীনে মানুষের হাত পা চেপে ধরে, তাকে যদি আপনি বোঝাতে চান যে স্লিপ প্যারালাইসিস নামক কোনকিছু একটা দুনিয়ায় আছে তাহলে আপনাকে মোটামুটি একটা যুদ্ধ করতে হবে। যে মানুষ বিশ্বাস করে সে জীন ভূত দেখতে পারে, সে যে সিজোফ্রেনিয়া নামক কোন রোগে আক্রান্ত এটা তাকে বুঝাতে হলে আপনকে মোটামুটি আগের মতোই এফোর্ট দেওয়া লাগবে। একই ভাবে কোন মানুষ যে বিবর্তনে বিশ্বাস করে না, তাকে আপনি যতই থিওরি দেন সে কোনদিন ই বিশ্বাস করবেনা বিবর্তন বলে কিছু একটা আছে। নোবেল প্রাইজকেও তারা ইহুদিআর খ্রিষ্টানদের ষড়যন্ত্র বলে উড়িয়ে দিবে, শত শত বিজ্ঞানীর বছরের বছর গবেষণা করা রিসার্চ পেপারকে তারা পাত্তাই দিবেনা। আপনি কিছুই করতে পারবেনা, এরপরেও যুক্তি দিতে গেলে আপনার ঘাড় থেকে মাথা আলাদা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। যেমনটা ৮০ হাজার মানুষের মৃত্যুও হিরোহিতোকে বুঝাতে পারেনি তার সারেন্ডার করা উচিৎ। যে মানুষ বিশ্বাস করে ভূল স্বীকার করে নিলেই তার মঙ্গল সে মানুষ খুবই আন্তরিক ভাবে তার ভুল স্বীকার করে নিবে, কিন্ত যে মানুষ বিশ্বাস করে ভুল স্বীকার করলে তার অসম্মান হবে তাকে দিয়ে আপনি কোনদিনই ভূল স্বীকার করাতে পারবেন না। প্রতিটা মানুষই আত্মসম্মান, ইগো এসব জিনিসে ভরপুর থাকে। মানুষের প্রতিটা বিশ্বাস হলো তার ইগোর একেকটা খুটি। যখন আপনার কোন মন্তব্য, আপনার বিশ্বাস, আপনার কার্যক্রম অন্য কোন মানুষের বিশ্বাস কে প্রশ্নমুখে ফেলবে, স্বাভাবিক ভাবেই সেই মানুষটা চাইবে তার সর্বোচ্চ দিয়ে তার বিশ্বাস টাকে টিকিয়ে রাখার, তার ইগোর দুর্গটাকে টলতে না দেওয়ার, যেমনটা করেছিলেন হিরোহিতো, লাদেন, হিটলার আর হোজ্জার মতো মানুষেরা। আপনার সোস্যাল মিডিয়া টাইমলাইনে যেসব টক্সিক পোস্ট দেখে থাকেন তার মূলেও রয়েছে এই একই থিওরি একই সাথে যেসব টক্সিক আইডিয়া আপনি সাপোর্ট করে যাচ্ছেন তার মূলেও হয়তো আছে একই থিওরি। আপনি হয়তো ভাবছেন বাকি সব মানুষদের থেকে আপনি আলাদা, আপনি স্পেশাল, আপনার মাঝে আলাদা কিছু আছে, কিন্ত বাস্তবতা হলো আপনিও বাকি সব মানুষের মতো সাধারণ একজন মানুষ। রাস্তায় আপনার পাশে দিয়ে হেটে যাওয়া মানুষটা যেমন সাধারণ একজন মানুষ, আপনিও তার মতো সাধারণ একজন মানুষ। আপনি তখনি স্পেশাল হবেন যখন আপনি এই জিনিসটা উপলব্ধি করতে পারবেন যে আপনিও একজন সাধারণ মানুষ, কারণ অধিকাংশ মানুষই এটা পারেনা। আপনাকে স্পেশাল বলা যাবে যদি আপনি আপনার বিশ্বাস কে প্রশ্ন করতে পারবেন যে "তুমি কি আসলেই ঠিক? যদি তুমি ঠিক হও কেন ঠিক? যদি অন্য মানুষ ভুল হয় কেন ভুল? এমন কি হতে পারে যে আমি ভুল আর অন্য মানুষ সঠিক?" এই সামান্য প্রশ্নগুলো যখন নিজের বিশ্বাসের দিকে ছুড়ে দিতে পারবেন, তখন বুঝবেন আপনি স্পেশাল, আপনি মানুষ হচ্ছেন। ইতিহাস ঘাটলে উপলব্ধি করতে পারবেন এই কাজটা হয়তো দুনিয়ার অন্যতম কঠিন কাজগুলোর একটা, ইতিহাসে হয়ে যাওয়া সব যুদ্ধবিগ্রহের কারণ কোন না কোন ভাবে ঘুরে ফিরে এসে এটাই দাঁড়ায়। আপনি যদি নিজের বিশ্বাস কে প্রশ্ন করতে পারেন, সেই বিশ্বাস যেটা আমরা মানুষ হিসেবে কেমন হবো আমাদের ব্যেক্তিত্ব কেমন হবে তা নির্ধারণ করে, সেই বিশ্বাস যার কারণে যুগের পর যুগ যুদ্ধ হানাহানি হয়ে আসছে, সেই বিশ্বাস যার কারণে হিটলারের নির্দেষে অগণিত ইহুদী প্রাণ হারায়, সেই বিশ্বাস যার জন্য জাপানে এত মানুষ প্রাণ হারায়, সেই বিশ্বাস যার কারণে ৪০ বছর আলবেনিয়ার মানুষ বন্দী হয়ে থাকে, সেই বিশ্বাসকে যদি আপনি প্রশ্ন করতে পারেন তাহলে নির্দিধায় বলা যাবে আপনি একজন স্পেশাল মানুষ।
- শাওন সিকদার
২/২৪/২০২৩
- লিঙ্ক পান
- X
- ইমেল
- অন্যান্য অ্যাপ
জনপ্রিয় লেখাসমূহ
স্বপ্ন কীভাবে মিলে যায়? স্বপ্নের আদ্যোপান্ত - লেখাঃ শাওন সিকদার
- লিঙ্ক পান
- X
- ইমেল
- অন্যান্য অ্যাপ
উদ্ভাসে পড়লেই বুয়েটে চান্স পাওয়া যায়? লেখাঃ শাওন সিকদার
- লিঙ্ক পান
- X
- ইমেল
- অন্যান্য অ্যাপ
বাটারফ্লাই ইফেক্টের ১৪ গোষ্ঠী - শাওন সিকদার
- লিঙ্ক পান
- X
- ইমেল
- অন্যান্য অ্যাপ
জীবনে উন্নতির আসল মানে কী? - শাওন সিকদার
- লিঙ্ক পান
- X
- ইমেল
- অন্যান্য অ্যাপ
মন্তব্যসমূহ