সাম্প্রতিক লেখাসমূহ

ম্যাচিউরিটি X শাওন সিকদার

ম্যাচিউরিটি হচ্ছে যখন আপনি উপলব্ধি করতে পারবেন যে "মানুষ মূলত এক"। হ্যা বুঝতে পারছি আপনার অনেক বন্ধুবান্ধব আছে যারা আপনাকে জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসে, আপনার জন্য সব ধরনের স্যাক্রিফাইস করতে প্রস্তত, আপনার একজন প্রেমিকা আছে যে আপনাকে সত্যিকারের ভালোবাসে, লয়ালটির দিক থেকে সে অতুলনীয়, আপনার জীবনে থাকার লিস্টে বলার মতো এমন বহু আইটেম আছে, তবুও আমি ঘুরেফিরে একই কথা বলবো, "মানুষ মূলত একা"।


সাধারনত মানুষ ম্যাচিউরিটি বলতে কী বুঝে? ফেসবুকীয় আবেগী লেখকদের দাঁড়িপাল্লায় যখন আপনি মাপবেন তখন হয়তো নিজের একাকীত্ব নিজের দুর্ভাগ্য গুলোকে চুপচাপ মেনে নেওয়াকেই ম্যাচিউরিটি বলে। আপনার ফ্যামিলির কাছে হয়তো আপনার জীবনের যাবতীয় দুঃখ গুলোকে কবর দিয়ে হাসিমুখে তাদের ভরন পোষন করতে পারাটাই আপনার ম্যাচিউরিটি। আপনার বন্ধুদের কাছে হয়তো আপনার পারিবারিক ব্যেক্তিগত সমস্যাগুলো মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে তাদের সাথে তাল মিলিয়ে আড্ডা দিতে পারাটাই ম্যাচিউরিটি। আপনার স্কুলের টিচারের কাছে হয়তো তাদের কথায় উঠবস করাটাই ম্যাচিউরিটি, পাশের বাড়ির আন্টির কাছে হয়তো আপনার বুয়েট মেডিকেল এ চান্স পাওয়াটাই ম্যাচিউরিটি। প্রেমিকার কাছে হয়তো আপনার ক্যারিয়ার নিয়ে সিরিয়াস থাকাটাই ম্যাচিউরিটি। মসজিদের হুজুরের কাছে হয়তো পাচ ওয়াক্ত নামাজ শেষে হাদিস নসিহতে একটু সময় দেওয়াটাই ম্যাচিউরিটি। আর আপনার কাছে ম্যাচিউরিটির সংজ্ঞা কী? আপনি হয়তো ভাবছেন আপনি ম্যাচিউর কারণ আপনি সবার চেয়ে একটু ভিন্ন ভাবে চিন্তা করতে পারেন। অধিকাংশ মানুষের থেকে একটু ভিন্ন ভাবে চিন্তা ভাবনা করার ক্ষমতাকে আপনি ম্যাচিউরিটির মানদন্ড হিসেবে ঠিক করে রেখেছেন। আমাদের আশেপাশের মানুষগুলো তাদের সুবিধামতো ম্যাচিউরিটির মানদন্ড ঠিক করে দেয়। যতক্ষন পর্যন্ত আপনার কার্যক্রম তাদের উদ্দেশ্য কোন রকম ঝামেলা ঝাড়াই সাধন করছে ততোক্ষন আপনার মাথার উপর ম্যাচিউর ট্যাগটা অবিচল থাকবে।

ছবি কৃতজ্ঞতাঃ গুগল

মানুষ মূলত দু-মুখো। আপনি ভাববেন নাহ যে আপনার আশেপাশে থাকে অন্য মানুষকে আমি দোষারোপ করছি আপনাকে বাদ দিয়ে। আপনি হয়তো জানেন না কিন্ত আপনি দু-মুখো। আমিও। মানুষ মাত্রই দুমুখো। মানুষ মূলত একা এর কারণ হচ্ছে মানুষ দুমুখো। ভেবে দেখুন আপনি হয়তো কারো পরিবারের সদস্য, কারো বন্ধু, কারো প্রতিবেশী, কারো ভালোবাসার মানুষ, এবার বলুন নিজেকে চেনা চেনা মনে হচ্ছে কি না? হয়তো দু একটা ক্ষেত্রে আপনি কাকতালীয়ভাবে ম্যাচিউর কিন্ত আমি বাজী ধরে বলতে পারি আপনি মূলত দু-মুখো। একটু ভেবে দেখুন শেষ কবে নিজের বাবা মায়েরর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিলেন নিজের জীবন উতসর্গ করে আপনাদের ভরন পোষণ করার জন্য? কিন্ত আপনি যখন বাবা মা হবেন আপনি তখন ঠিকই অবচেতন আশা করবেন সন্তানেরা আপনার দুঃখ বুঝুক। আর যখন বুঝবেনা তখন আপনি অনুভব করবেন মানুষ মূলত একা। শেষ কোন বন্ধুটাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন মনে আছে? আপনার বন্ধু যখন আপনাকে তার দুঃখের কথা শুনাতে আসে তখন তো মুখের উপর বলে দেন যে, "বাদ দে! এসব নিয়ে ভাবিস না!" কিন্ত আপনি যখন বন্ধুকে দুঃখের গল্প বলতে গিয়ে একই জবাব পান তখন আপনি অনুভব করেন, মানুষ মূলত একা। আপনার প্রতিবেশি যখন কোথাও চান্স না পায় তখন হয়তো তাকে নিয়ে ঠিকই টিপ্পনি কাটেন কিন্ত আপনি চান্স না পাওয়ার পরে প্রতিবেশী টিপ্পনী কাটে তখন আপনি বুঝতে পারেন যে, আপনি মূলত একা। দেখুন মানুষ মূলত একা সত্য তারচেয়েও বড় সত্য হলো মানুষ মূলত দুমুখো। আর প্রতিবেশি, ভালোবাসা, বন্ধুবান্ধব, একাকীত্ব এসব জিনিস নিয়ে যারা ডিপ্রেশনে থাকে কিংবা আত্মহত্যা করে, তারা দুমুখো হওয়ার চরম সীমায় পৌছে গেছে।

শুধু যে মানুষ দুমুখো এমন কিন্ত না, আমাদের সমাজ হচ্ছে বহুমুখো। দুমুখো মানুষেরা নিজেদের সুবিধার জন্য সমাজটাকে মরীচিকার স্তর দিয়ে পূর্ণ করেছে। আপনার চারপাশে আপনি যা দেখেন সবই মূলত মরীচিকা। আপনি যখন আওয়ামীলীগ দেশকে চুষে খাচ্ছে বলে কান্না করছেন, বিএনপি বা জাতীয় পার্টি ক্ষমতায় আসার জন্য কান্নাকাটি করছেন তখন আপনি বুঝতেও পারছেন নাহ, আপনি একই গর্তে বার বার পড়ছেন। বাঙালী মূলত আজও পরাধীন। লক্ষ করলে দেখবেন স্বাধীনতার পর থেকে দু তিনটে পরিবারই আমাদের ঘুরেফিরে শাষন শোষন করে আসছে। যারা এখন দেশে অবিচার চলছে বলে কান্না করছে তারাও দেষকে একসময় চুষে খেয়েছে, আবার খাওয়ার অপেক্ষায় আছে, যারা এখন দেশ শাষন করছে তারাও ইচ্ছেমতো শোষন করছে দেশটাকে, আপনি মুক্তির আশায় কোথায় যাবেন? যাওয়ার কোন রাস্তা নেই, এবার আপনি বুঝতে পারছেন আপনি কী ভয়ানক রকমের একা?

আপনি হয়তো ধর্ম নিয়ে অনলাইন অফলাইনে মারামারি করছেন, কিন্ত আপনার অন্ধবিশ্বাস নিয়ে মূলত ব্যবসা করছে একদল ধর্মব্যবসায়ী। আপনি যখন জানবেন ইহকাল পরকালের লোভ আর ভয় দেখিয়ে যে ধর্ম গুরু আপনাকে উষকাচ্ছে তার ব্যাংক ব্যালেন্স মূলক কয়েকশত কোটি টাকা, আপনার সারাজীবনের বিশ্বাসের ফলাফল মূলত শূন্য, তখন আপনি বুঝবেন মানুষ মূলত একা। সিস্টেম টা সাজানো হয়েছে কিছু দুমুখো মানুষের ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের জন্য যেখানে আপনি আমি সবাই দাবা খেলার একেকটা সৈন্যের মতো অন্য কারো দারা পরিচালিত হচ্ছি।

এডমিশন সিজনে পাব্লিকে চান্স না পাওয়া ছেলেটা যখন ডিপ্রেশনে থাকার পরে কাব্যিক ভাষায় আবেগি একখানা নোট লিখে সুইসাইড করে, তখন সে এটাই জানেনা যে এসব পাব্লিকে চান্স পাওয়া মূলত নাটক। কোচিং সেন্টার গুলো নিজেদের ব্যবসায় লাভবান হওয়ার জন্য, অযাচিত প্রচার করতে করতে এডমিশন কে অন্য লেবেলের হাইপ দিয়ে দিয়েছে। কথায় আছে মিথ্যা বার বার বললে সেটা সবাই সত্য বলে মেনে নেয়। কোচিং গুলাও প্রচার করে করে পাব্লিক ইউনিভার্সিটি গুলোকে মহা মূল্যবান কিছু বানিয়ে দিয়েছে, কিন্ত এগুলো মূলত নাটক। আপনি যখন যুক্তিদিয়ে বিচার করবেন তখন বাংলাদেশ হলো মূলত একটা গরিব দেশ, এমন একটা গরিব দেশ যার আনাচে কানাচে দুর্নীতিতে ভরা, মানুষ চাকরি না পেয়ে সুইসাইড করে, লক্ষ লক্ষ মাস্টার্স করা তরুন তরুনী বেকার বসে আছে, না আছে ভালো পরিবেশ না আছে ভালো বিচার ব্যবস্থা না আছে ভালো শিক্ষাব্যবস্থা। পৃথিবীর সবচেয়ে নিম্নমানের শিক্ষাব্যবস্থাগুলোর মাঝে অন্যতম হলো বাংলাদেশের ইউনিভার্সিটি গুলোর পড়াশোনা। কোচিংয়ের প্রচারণা গুলো আপনাকে বলবে আপনি পাব্লিকে চান্স পাওয়া মানে মহামূল্যবান কিছু পাচ্ছেন কিন্ত আপনি মূলত যা পাচ্ছেন তা হচ্ছে গরীব একটা দেশের অসুস্থ দুর্নীতিগ্রস্থ একটা সিস্টেমের কিছু মধ্যমমানের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রাজুয়েট হয়ে দেশে অলরেডি থাকা লক্ষ লক্ষ বেকারের তালিকায় আরেকটা নাম্বার হয়ে যোগ দিচ্ছেন। এবার ভাবুন যে ছেলেটা পাব্লিকে চান্স না পেয়ে আত্মহত্যা করলো, সে মূলত কতটা একা।

আপনি যখন আপনার প্রিয় সেলিব্রিটির বিচ্ছেদ হওয়ার সঙ্কায় কাতর তখন আপনার বিন্দুমাত্র ধারণা নেই যে আপনার প্রিয় সেলিব্রিটি তার নতুন শো এর প্রচারের জন্য স্ক্রিপ্টেড কন্ট্রোভার্সি ক্রিয়েট করছে। আপনি যখন প্রেমিকার কোলে শুয়ে শুয়ে অনুভব করছেন পুরো দুনিয়ায় আপনার আর চাওয়ার মতো কিছুই নেই তখন আপনি বুঝতেই পারছেন না এসব প্রেম ভালোবাসা মূলত হরমোনের লীলাখেলা। আপনার মস্তিষ্ক যখন এই হরমোনের সাথে মানিয়ে নিবে এই স্বর্গীয় অনুভূতি আর থাকবেনা। আপনি যখন দু চার জন বন্ধুর মাঝে থেকে নিজেকে সৌভাগ্যবান ভাবছেন তখন আপনি বুঝতেও পারছেন না তারা আপনাকে নিয়ে আপনার মতো করে ভাবে কি না। বন্ধুত্ব ভালোবাসা সহ দুনিয়ার অধিকাংশ সম্পর্কই নিঃস্বার্থ হয়না, চেতন অবচেতন মনে কি ধরনের স্বার্থ জড়িত থাকে তা যদি আপনি খুজে পান আপনি বুঝবেন আপনি মূলত একা! আমাদের ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন সবকিছুই মূলত অন্য মানুষের দ্বারা স্ক্রিপ্টেড। অন্য মানুষের ইনফ্লুয়েন্সে পরিচালিত হয়। ট্রাপের মতো আটকে আছি আমরা এই স্ক্রিপ্টের গোলকধাধায়।


আপনি যদি এই ব্যাপারগুলো বুঝতে পারেন, অনুভব করতে পারেন তাহলে অভিনন্দন। আপনি ম্যাচিউরিটির প্রাথমিক পর্যায়ে আছেন। আপনি যখন ম্যাচিউর হবেন তখন আপনি বুঝবেন যে মানুষ মূলত একা, সত্য অনেক ভয়াবহ। এর মানে এই না যে এই ভয়াবহ সত্যের পরেই আমাদের চিরসমাপ্তি। আপনি যদি ম্যাচিউরিটির প্রাথমিক পর্যায়ে এসে পড়েন তাহলে আপনার অন্তত এইটুকু বুঝা উচিৎ ছোট্ট এই জীবনে সত্যিকারের ভালোবাসা কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ। মরিচীকা আর কৃত্রিমতার অন্ধকার দিয়ে ভরপুর চারিপাশে আপনার একটুখানি হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা নাহয় আলো হয়ে আসুক। আপনি যদি বুঝতে পারেন পাব্লিকে চান্স পাওয়া মূলত একটা নাটক, তাহলে চান্স না পাওয়া ছেলেটার কাছে গিয়ে একটু সহমর্মী হোন। ডিপ্রেশনে থাকা বন্ধুকে,"থাক বাদ দে।" না বলে তার কাধে একটু হাত রাখুন, তার কথা গুলো শুনুন। রাস্তায় খাবার চাওয়া বাচ্চাটাকে তাড়িয়ে না দিয়ে খানিক হাসিমুখে কথা বলুন, পারলে সাহায্য করুন। কৃত্রিমতা বাদ দিয়ে হৃদয় নিংড়ানো সহমর্মিতা দিয়েই শুরু হোক সহমর্মিতার আদান প্রদান। একটা জিনিস জানেন, আপনি ম্যাচিউরিটির হাজার হাজার ব্যাখ্যা পড়তে পারেন, হাজার হাজার থিওরি নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা আলোচনা করতে পারেন কিন্ত দিনশেষে পাশের মানুষটার প্রতি আন্তরিক ভাবে সহমর্মি হওয়া, নিরহংকার হওয়া, দয়াশীল হওয়াই হলো চূড়ান্ত ম্যাচিউরিটি। আপনি যখন কারো প্রতি আন্তরিক ভাবে সহমর্মি হচ্ছেন তখন আপনি তাকে "মানুষ মূলত একা" এই অনুভূতি থেকে মুক্তি দিচ্ছেন। এতে আপনার কী লাভ? দেখুন আপনার লাভের গ্যারান্টি তো আমি দিতে পারবোনা, কিন্ত এই মানসিকতা যদি আপনি ছড়িয়ে দিতে পারেন তাহলে আমি আশা করেত পারি আপনিও একদিন কাউকে পাবেন যে আপনার "মানুষ মূলত একা" অনুভূতি থেকে মুক্তি দিবে।

লেখাঃ শাওন সিকদার

১৩/৬/২০২৩

মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় লেখাসমূহ