সাম্প্রতিক লেখাসমূহ
- লিঙ্ক পান
- X
- ইমেল
- অন্যান্য অ্যাপ
ছোটগল্পঃ মশা বিভ্রাট- শাওন সিকদার
সেদিন রাত প্রায় ১২ টা বাজে, মশারির ভেতর হা করে অঘোরে ঘুমাচ্ছিলাম। হুট করেই মশা মহাশয় তার গোত্রের কর্তাদের নিয়ে আমার মশারির ভেতরে হাজির।আমি ঠুস ঠাস শব্দে জেগে উঠলাম।উঠে দেখি এমা, এই পিচ্চি মশা কামান বন্দুক নিয়ে এসেছে।ঠুস ঠাস কামানের গোলা নিক্ষেপ করে মশারি ফুটো করে ভেতরে চলে আসছে।
এমন ভৌতিক কান্ডে আমি বেমালুম বেকুব বনে গেলাম। দিশাহীন হয়ে আমি যেই না চিৎকার করতে যাবো ওমনি একটা কামানের গোলা এসে আমার মুখে পড়লো।সাথে সাথে আমি শান্ত হয়ে গেলাম।মনে হয় ম্যাজিক হয়ে গেছে।আমি মশাদের ভাষা বুঝতে পারতেছি।
চশমা পড়া একজন মশা হয়তো মশাদের নেতা গোছের কিছু হবে, হাত উচিয়ে বসে "শাওন সাহেব, চিৎকার দিয়েন না।আপনাদের মানব জাতির অত্যাচারে আমরা মশা জাতি অতিষ্ঠ।আজ তার একটা হেস্তনেস্ত করতে এসেছি।আজকে এর কোন বিহিত না করে আমরা যাবো না, না মানে একেবারেই না"
আমি তো হতভম্ব হয়ে বসে আছি। তবে ব্যাপারটা তো ইন্টারেস্টিং। মশাদের বিচার সভায় মানব জাতির পক্ষ থেকে আমাকে প্রতিনিধি করা হয়েছে।এখন প্রতিনিধি যখন করেছে তখন কি আর করার,আর যাই হোক এই মশাদের কাছে মানব জাতির হারা একদম মানায় না।করোনার কারণে যদিও দীর্ঘদিন পড়াশোনা হয়নি তবুও এই বিচারে আমি সর্বোচ্চ দিয়ে যাবো। মশাদের নেতার দূরদর্শিতা আমি এখনি টের পেলাম। দীর্ঘদিন যে আমি পড়াশোনা করিনা এরা তো সবই দেখে এজন্য বেছে বেছে আমাকেই নির্ধারণ করলো যাতে সহজে হারাতে পারে।কিন্ত এরা তো জানেনা আমি কোরাতে লেখালেখি করি।খেলা জমবে এবার।
চশমা টা ঠিক করতে করতে মশা মহাশয় বলা শুরু করলো," প্রথমেই আমার পরিচয় দিয়ে নেই।আজকে আমি ইউনিভার্স জাস্টিস কাউন্সিলের অনুমতি নিয়ে মশাদের প্রতিনিধি হয়ে এসেছি।আমাত নাম ঝন্টু মিয়া, দক্ষিন খালের বাপ পাশের ডাস্টবিনে ভাঙা বালতিতে আমার বাসা।"
আমি বললাম" ওয়েট ওয়েট, এই ইউনিভার্স জাস্টিস কাউন্সিল টা কী আবার?"
মশাদের নেতা ঝন্টু মিয়া বিজ্ঞের হাসি দিয়ে বললো"আরে শাওন মিয়া, মানুষেরা ভাবে তারাই জ্ঞান বিজ্ঞানে এগিয়ে আর আমরা কিছু না।এটা এমন একটা কাউন্সিল, ইউনিভার্সে যদি কোন এক জাতি অন্য জাতির উপরে অত্যাচার করে তাহলে এই কাউন্সিল তার বিচার করে।আর আজকে আপনি এই বিচারে হারলে আমাদের ১০০ মশা সৈনিক আপনার রক্ত চুষে খাবে।"
এসব ভয়ংকর করা কথা শুনে আমার রক্ত হিম হয়ে এলো।এবার বুঝি শেষ আমি।বলতে চেস্টা করলাম,"কিন্ত….."
প্রবল কঠে এক ঝাড়ি দিয়ে ঝন্টু মিয়া বললো,"আরে রাখেন আপনার কিন্ত কিন্ত, এইতো সেদিন আমাগো উত্তর খালে থাকা বোতলের পচা পানির ছন্টুর ছেলে মন্টু, মনের আনন্দে গান করতে করতে উইড়া যাইতাছিলো শাওন সাহেব! কি বলবো আর দুঃখের কথা, হুট করেই ঠুস করে একটা শব্দ হইলো।আর সেই সাথে জীবনের অবসান হইলো মন্টুর,জানেন সেই খুনী কে ছিলো শাওন সাহেব?আপনি ছিলেন আপনি। বউ অনেক কাল আগে কোন মানুষের হাতে মইরা গেছিলো, বউ হারা ছন্টু একমাত্র ছেলে মন্টুরে হারায়া বিটিএস ফ্যানদের বিষাক্ত রক্ত খায়া আত্মহত্যা কইরা ফালাইছে শাওন সাহেব! একটা পরিবার আপনারা মানুষেরা এমনে ধংস করে দিলেন।"
আমার মাথায় বজ্রের মতো আঘাত হানলো ঝন্টু মিয়ার অভিযোগ গুলো।প্রতিদিন কতো মশা মারি।কবে এই মন্টুরে মেরেছি মনে নেই।তবে এই একটা কাজের জন্য মশাদের জীবনে কত প্রভাব আসে ভেবেই আমার মনটা অপরাধবোধে বিষিয়ে উঠলো।নিজের পক্ষে দুর্বল একটা যুক্তি উপস্থাপন করতে চাইলাম, যদি এই দায় থেকে বাচা যায়,"কিন্ত ঝন্টু সাহেব মন্টুর গান আমার অনেক বিরক্ত লাগতেছিলো, তাই হাত দিয়ে সরানোর সময় ভুলবসত আরকি…"
গর্জে উঠলো ঝন্টু মিয়া,"আপনি মাইকেল জ্যাকশন রে চিনেন?ওই বেটা কত টাকা নেয় গান শুনানোর লাইজ্ঞা?টিকিট কিন্না গান শুনেন ওর।আর আমাগো নওজোয়ানেরা আপনারে ফ্রী তে গান শুনায়, মাইকেল জ্যাকশন পায় টাকা,হাতে তালি,বাহবা! আমরা পাই মৃত্যু!কেন এই অবিচার শাওন সাহেব?"
লজ্জায়, অপরাধবোধে কান্না চলে এসেছে আমার।সত্যিই তো।আমরা মানব জাতিরা কীভাবে এত নিষ্ঠুর হতে পারি?আজকে বোধয় হেরে যাবো এই বিচারে।তবুও একটা শেষ যুক্তি উপস্থাপন করি মানুষ জাতির হয়ে,"মিস্টার ঝন্টু, অনেক কথা বলেছেন।অনেক কথা শুনেছি আপনার।আর নয়!আপনারা মশা জাতি আমাদের উপরে আরো অবিচার করেন।বিনা অনুমতিতে এসে আমাদের রক্ত খেয়ে নেন।এটা কি অন্যায় নয় মানুষ জাতির প্রতি?আপনাদের তাড়াতে গিয়ে নিজেদের গালে আমরা ঠাসঠুস চড় খাই।মশা সাহেব!জানেন কত ব্যাথা পাই?এজন্য কি মশা জাতির বিচার হওয়া উচিৎ হয়?"
একটু ঘাবড়ে গেলেন মশাদের নেতা ঝন্টু মিয়া।থতমত খেয়ে বললেন," শাওন সাহেব! আপনে শান্ত হন একটু।এটার উত্তর দিচ্ছি আমরা। শান্ত হন।রাগের কি আছে আমরা আমরাই তো।প্লিজ শান্ত হোন"
বাহ! ব্যাটা ঝন্টুর বাচ্চাকে এবার বাগে আনতে পেরেছি।বেটা কতবড় জোচ্চর, এতক্ষন কেমন বাঘের মতো হুমকি দিচ্ছিলো আর এখন একেবারে বিড়াল হয়ে গেছে।এই ব্যাটার বিশ্বাস নেই।এই সুযোগেই এদের কুপোকাত করে দিতে হবে।বজ্র কঠে বলে উঠলাম," না না না! কেন শান্ত হবো আমি ঝন্টু সাহেব?কেন?এইযে এত মিথ্যে অপবাদ মানব জাতির নামে,এসব কেন সহ্য করবো আমি।কোথায় ইউনিভার্স জাস্টিস কমিউনিটির বিচারক? ডাকেন তাদের।আজকে এখানে এই মঞ্চে মশা জাতির বিচার দেখতে চাই।যাতে কোন মানুষকে মশা থেকে বাচার জন্য নিজ গালে চড় মারতে না হয় আর কখনো"
ভেবেছিলাম এই বানে হয়তো মশা জাতি কুপোকাত হয়ে যাবে।কিন্ত না! বেটা বজ্জাত মশা কি যেন চিন্তা করে চুপ হয়ে।এর নিশ্চুপ অবস্থা দেখে আবার ভয়ে আমার গা হিম হয়ে এলো! বেশ কিছুক্ষন ভাবার পরে আস্তে আস্তে বিজ্ঞের মতো চশমা নেড়ে মশাদের নেতা ঝন্টু সাবেহ বলে উঠলো," শাওন সাহেব!মানলাম আমরা আপনাদের রক্ত খাই?কিন্ত আপনারা কি খান?একটা জীবন্ত পশুকে জবাই করে দিয়ে তাদেরকে খেয়ে ফেলেন!পানি থেকে একটা মাছকে তুলে এনে অক্সিজেন এর সল্পতায় তিলে তিলে হত্যা করেন।তাও ছাড়েন না।তাদেরকে কেটেকুটে খেয়ে ফেলেন।একটা জীবন্ত গাছের অঙ্গ ছিড়ে এনে কাচা বা রান্না করে খেয়ে ফেলেন! কখনো ভেবে দেখেছেন অঙ্গহানী হওয়ার পর ওই গাছটা কীভাবে কাতরায়??অনেকে কাতরাতে কাতরাতে মারা যায়। এত পাষন্ড মানব জাতির রক্ত খাওয়া কি সমীচীন নয় শাওন সাহেব?তাছাড়া মশারা আর কতটুকুই রক্ত খায়?তারচেয়ে বেশি রক্ত আপনাদের শরীরে তৈরী হয়। এতে আপনাদের কোন অসুবিধে থাকার কথা নয়।তবুও শুধু নিজেদের পেটের খিদে মেটাতে একটু রক্ত খাওয়ার জন্য প্রতিনিয়ত কত মশা সৈনিক আপনাদের হাতে শহিদ হয়।এসব কি অবিচার নয় শাওন সাহেব?এর জন্য কি বিচার হওয়া উচিৎ নয় আপনাদের?"
আমার শেষ বানটাও এক ঝটকায় উড়িয়ে দিলো মশাদের নেতা ঝন্টু মিয়া। এই মশা এত বুদ্ধিমান হবে আমি ভাবিনি কখনো। আমি নির্বাক হতবিহ্বল হলে নিশ্চুপ রইলাম।এখন মনে হয় আর বাচার কোন উপায় নেই।তবুও মরন কামর দেওয়ার জন্য বলার চেস্টা করলাম" আপনাদের রক্ত খাওয়ার কারণে আমাদের কত অসুখ……"
গর্জে উঠে নেতা ঝন্টু সাহেব বললো "আরে রাখ তোর অসুখ…ফালতু প্যাচাল পারে।" পাশে থাকা একটা যোদ্ধা টাইপের মশারে অর্ডাল দিলো ঝন্টু সাহেব,
-Carly Carly Commander Pintu
-Yes sir!
-Attack!!!!
সাথে সাথে শ খানেক মশা উড়ে আসতে লাগলো।আমার দিকে।ভোওওওওওও শব্দে মশারি একাকার হয়ে গেলো।চারদিকে অন্ধকার দেখতে লাগলাম।প্রথম মশাটা এসেই আমার গালে কামড় বসালো।মশাটাকে তাড়ানোর জন্য ঠুস করে একটা বারি মারলাম।কিন্ত সেটা চর হয়ে আমার গালেই লাগলো।সাথে সাথে লাফ দিয়ে ঘুম থেকে জেগে উঠলাম।ঘামিয়ে গিয়েছি একদম।পুরো শরীর ঘামে ভিজা।আল্লাহ! তার মানে এগুলো সব স্বপ্ন ছিলো।হাতের দিকে তাকালাম, একটা মশা রক্তাক্ত অবস্থায় পরে আছে।এটাই আমার গালে বসেছিলো,এটাকে মারতে গিয়েই এমন চর খেয়ে এই দুঃস্বপ্ন থেকে জেগে উঠেছি। রক্তাক্ত মশাটাকে দেখে বুকে হিম ধরে এলো! মনে হয় রক্তাক্ত মশাটা আমার দিকে তাকিয়ে আছে।কিছু বলতে চায় আমাকে।পাশে তাকিয়ে দেখলাম মশারির এক কোনা মাটিতে পরে আছে।এটা ভালো ভাবে সাটানো হয় নি। এই ফাক দিয়েই মশাটা ঢুকেছে।আল্লাহর নাম নিয়ে ঠিক করে নিলাম। হঠাৎ কোথায় যেন ঠুস করে একটা শব্দ হলো।আমি নিশ্চুপ!
লেখকঃ শাওন সিকদার
২৭/৯/২০২১
১১ঃ৪০ AM
- লিঙ্ক পান
- X
- ইমেল
- অন্যান্য অ্যাপ
জনপ্রিয় লেখাসমূহ
স্বপ্ন কীভাবে মিলে যায়? স্বপ্নের আদ্যোপান্ত - লেখাঃ শাওন সিকদার
- লিঙ্ক পান
- X
- ইমেল
- অন্যান্য অ্যাপ
উদ্ভাসে পড়লেই বুয়েটে চান্স পাওয়া যায়? লেখাঃ শাওন সিকদার
- লিঙ্ক পান
- X
- ইমেল
- অন্যান্য অ্যাপ
বাটারফ্লাই ইফেক্টের ১৪ গোষ্ঠী - শাওন সিকদার
- লিঙ্ক পান
- X
- ইমেল
- অন্যান্য অ্যাপ
আমাদের ব্যক্তিত্বের কোন দিক পরিবর্তন করা সবচেয়ে কঠিন? - শাওন সিকদার
- লিঙ্ক পান
- X
- ইমেল
- অন্যান্য অ্যাপ
জীবনে উন্নতির আসল মানে কী? - শাওন সিকদার
- লিঙ্ক পান
- X
- ইমেল
- অন্যান্য অ্যাপ
মন্তব্যসমূহ