সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

সাম্প্রতিক লেখাসমূহ

ম্যাচিউরিটি X শাওন সিকদার

ম্যাচিউরিটি হচ্ছে যখন আপনি উপলব্ধি করতে পারবেন যে "মানুষ মূলত এক"। হ্যা বুঝতে পারছি আপনার অনেক বন্ধুবান্ধব আছে যারা আপনাকে জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসে, আপনার জন্য সব ধরনের স্যাক্রিফাইস করতে প্রস্তত, আপনার একজন প্রেমিকা আছে যে আপনাকে সত্যিকারের ভালোবাসে, লয়ালটির দিক থেকে সে অতুলনীয়, আপনার জীবনে থাকার লিস্টে বলার মতো এমন বহু আইটেম আছে, তবুও আমি ঘুরেফিরে একই কথা বলবো, " মানুষ মূলত একা "। সাধারনত মানুষ ম্যাচিউরিটি বলতে কী বুঝে? ফেসবুকীয় আবেগী লেখকদের দাঁড়িপাল্লায় যখন আপনি মাপবেন তখন হয়তো নিজের একাকীত্ব নিজের দুর্ভাগ্য গুলোকে চুপচাপ মেনে নেওয়াকেই ম্যাচিউরিটি বলে। আপনার ফ্যামিলির কাছে হয়তো আপনার জীবনের যাবতীয় দুঃখ গুলোকে কবর দিয়ে হাসিমুখে তাদের ভরন পোষন করতে পারাটাই আপনার ম্যাচিউরিটি। আপনার বন্ধুদের কাছে হয়তো আপনার পারিবারিক ব্যেক্তিগত সমস্যাগুলো মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে তাদের সাথে তাল মিলিয়ে আড্ডা দিতে পারাটাই ম্যাচিউরিটি। আপনার স্কুলের টিচারের কাছে হয়তো তাদের কথায় উঠবস করাটাই ম্যাচিউরিটি, পাশের বাড়ির আন্টির কাছে হয়তো আপনার বুয়েট মেডিকেল এ চান্স পাওয়াটাই ম্যাচিউরিটি। প্রে...

জীবনে এগিয়ে যাচ্ছেন, নাকি র‍্যাট রেসে দৌড়াচ্ছেন? - শাওন সিকদার


আসুন আপনার জীবনের ছোটখাটো পর্যালোচনা করি। শুধু আপনার না কিংবা আপনি না হলেও অধিকাংশ মানুষের জীবনের গ্রাফ এটা।চলুন শুরু করা যাক।

আমাদের জীবনটা আসলে কীভাবে কাটে? বাচ্চাকাল থেকেই শুরু হয় আমাদের স্কুল প্রাইভেটের দৌড়াদৌড়ি। ক্লাশ ২-৫ এ থাকতেই একটার উপর পাচটা প্রাইভেট সারাদিন এই টিচার থেকে ওই টিচার এসে প্রাইভেট পড়ায় আমাদের। এরপর বাসা থেকে স্কুল, স্কুল থেকে বাসা, বাসা থেকে স্কুল। বাসায় এসে প্রাইভেট আবার মোক্তব, এক্সট্রা কারিকুলাম এক্টিভিটি আরো কত্তোকিছু! এভাবেই চলে যায় আমাদের বাচ্চাকাল।

এরপর আস্তে আস্তে আমরা মোটামুটি একই ধাপ অতিক্রম করে, প্রায় একই ভাবে এসে যাই উচ্চমাধ্যমিকে। তারপর শুরু হয় ভার্সিটির জন্য যুদ্ধ। প্রায় আমাদের অধিকাংশ অংশ দিনরাত খাটা শুরু করি একটা ভালো ভার্সিটির জন্য।দিন নেই রাত নেই যখনি সময় পাই অমানুষিক লেবেলের পরিশ্রম করি একটা ভালো ভার্সিটির জন্য। এই স্যার থেকে ওই স্যার, এ কোচিং থেকে ওই কোচিং, অমুক ভাইয়া থেকে তমুক ভাইয়া এরকম দৌড়াদৌড়ি করতে করতে আমাদের দিন কেটে যায়। এরপর গাধার মতো খাটতে খাটতে শেষ হয় আমাদের

উচ্চমাধ্যমিক। তারপর কেউ হয়তো পেয়ে যাই আমাদের স্বপ্নের ভার্সিটি। কেউ হয়তো অন্য কোন ভার্সিটি। কেউ বা অন্য কোথাও পায় না।

যাই হোক এরপর শুরু হয় জীবনের আরেকটা পর্যায়। সমাজের একটা শ্রেনীর মানুষের কাছে প্রশংসা দিয়ে শুরু হয় আমাদের ভার্সিটি লাইফ। আকাইম্মা এসব মানুষের প্রশংসা শুনে মনে হয় ভার্সিটি না দুনিয়া জয় করে ফেলেছি। এরপর আস্তে আস্তে ভার্সিটি লাইফ, ট্রাভেলিং, এক্সট্রা কারিকুলাম এক্টিভিটিজ, রিলেশন এসবে সময় দিতে দিতে কীভাবে যে ভার্সিটি লাইফ শেষ হয়ে যায় কেউ টের পাই না।

এরপর আসে বিয়ের পালা! সংসার জীবন শুরুর সময় থেকে এই র‍্যাট রেসের সূচনা বলা যায় বা তারও আগে। কিংবা তারও আগের আগে।সংসার শুরু মানে বিয়ের আয়োজন, তা যতই যৎসামান্য হোক না কেন। পরিবার ও অভিভাবকদের থেকে একটা বড় অংশ, বাকিটা নিজের কিছুটা সঞ্চয়, ব্যাংকের লাইফস্টাইল লোন, এমন কি ধার কর্য! অনুষ্ঠান যতটা সুন্দরভাবে আয়োজন করা যায় নববধূ আর নতুন বরের জন্য। যৌতুক, উপঢৌকনের বাড়তি সামাজিক সমস্যা এখানে উহ্য রাখি।

সংসার শুরু হলো। আর সংসার শুরু হওয়া মাত্র রেসের পরবর্তী অধ্যায়। হানিমুনের মুড চলে যেতে সময় লাগে না সঞ্চয়ের জন্য ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আর ব্যাংকিং নিয়ে ভাবনা চিন্তা করতে করতে। চাকরি, বেতন, প্রোমোশন সব প্রতিযোগিতায় দৌড়াতে হবে পাল্লা দিয়ে। স্বামী-স্ত্রী দু’জনকেই।

ভবিষ্যৎ অর্থাৎ ফিউচার সুনিশ্চিত করতে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সূত্র ধরে ক্রেডিট কার্ড, গাড়ি কেনার লোন, ফ্ল্যাট কেনার লোন, কনজুমার লোন, লাইফস্টাইল লোন ইত্যাদি ইত্যাদি। স্ট্যাটাসের সাথে কম্প্রোমাইজ করা যাবে না কোনভাবেই। ধীরে ধীরে একদিন সব শোধ হয়ে যাবে।

এক সময় লোনের কিস্তি বা ইন্সটলমেন্ট দেওয়ার পালা চলে এলো। এর মাঝে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে খরচের ব্যাপ্তি বেড়েছে। প্রায় প্রতিদিন বাড়তি ইন্টারেস্ট গুনতে হচ্ছে। ও হ্যাঁ, গাড়ি-বাড়ির সাথে লাইফ ইন্স্যুরেন্স কিন্তু লাইফস্টাইলে জায়গা করে নিয়েছে পাকাপোক্তভাবে। এসব করতে করতে জীবনটা কিস্তি, কিস্তি আর কিস্তি!

কিস্তি নিয়মিত রাখতে চাকরিতে দায়িত্বের বাইরে গিয়ে প্রতিযোগিতা, কর্পোরেট পলিটিক্স, সরকারি ক্ষেত্রে ঘুষ আর বেসরকারি ক্ষেত্রে কমিশন সব জীবনের শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে মিলেমিশে একাকার।

ব্যাস হলো তো! এবার স্ট্রেস আসার পালা শরীর-মন সবখানে। ঘরে-বাইরে-পরিবারে। সোসাইটি আর রাষ্ট্র বাদ যাবে কেন? রেসে একবার যখন নেমেছি ‘আমিই জিতবো’ ভাবনাটা বাদ দিলে চলবে না।

মাঝখান দিয়ে যদি সৌভাগ্যক্রমে বা নেহাতি ভুলবশতঃ আবেগ ভালোবাসার মিলনে নতুন কোন জীবন পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হয়ে যায়, বেচারা না বুঝেই রেসের সামনের দিনের প্রতিযোগী হয়ে যাবে।

সন্তান এলো- কিছুদিন আনন্দ হৈ হুল্লোড় চললো পরিবার পরিজনদের নিয়ে। যাহ বাবা! সেও একদিন স্কুলে যাওয়ার বয়সে পৌঁছে গেছে। খোঁজ শুরু হলো ভালো স্কুলের, নামকরা স্কুল, সহজে ভর্তি হওয়া যায় না এমন স্কুল হতে হবে। ডোনেশন লাগলে দেব, অসুবিধা নেই। আমাদের দাদা-নানা ভালো স্কুলে পড়েছেন, আমাদের বাবা-মা নামীদামী স্কুলে পড়েছেন, আমরা পড়েছি। সন্তানকেও ভালো, নামীদামী স্কুলে ভর্তি করতে হবে। না হলে মানুষ হবে কিভাবে?

এরপর শুরু হয় সন্তানদের জন্য ভালো ভার্সিটি বা ভালো একটা শিক্ষা নিশ্চিত করার যুদ্ধ। দিনরাত খেটে খেটে পরিশ্রম করে টাকা ইনকাম করি। সেই টাকা পুরোপুরি সন্তানদের পেছনে ঢালি। দিনরাত কেবল একটা চিন্তা আমার সন্তান ভালো একটা ভার্সিটিতে চান্স পাক। আমার সন্তান ভালো ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হোক। সমাজের সেই আকাইম্মা শ্রেনী আমার সন্তানের প্রশংসা করুক। এরপর দেখাযায় একদিন সবই হলো। আপনার সন্তান আপনার মতো ভালো ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হলো তার বিয়ে হলো সে আবার তার সন্তানদের জন্য এসব চিন্তা করলো।তার সন্তানকে কীভাবে তারমতো করে গড়ে তুলা যায়। এরমধ্যে একদিন টুক করে আপনি মারা গেলেন। তারপর দেখাযাবে আপনার সন্তানও একদিন এভাবে আপনার মতো করে দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে গত হবে। চিন্তা করে দেখুন আপনার বাবাও অনেকটা একই ভাবে গত হয়েছে।আর এখানেই আসে র‍্যাট রেস বা ইদুর দৌড়ের ধারণাটি।স্বার্থসিদ্ধির বা নিজের উন্নতির জন্য বেপরোয়া প্রতিযোগিতাকেই র‍্যাট রেস বা ইদুর দৌড় বলে। আমাদের পূর্বপুরুষেরাও এই দৌড়ে ছিলো, আমরাও এই দৌড়ে আছি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মও এই দৌড়ে থাকবে। আর ভদ্র সমাজের তথাকথিত ভাষায় এটাই জীবন।

ভেবে দেখুন,নিজের জীবন টা আমরা কীভাবে নষ্ট করেছি বা করতেছি!শুধু তাই না পাশাপাশি চলে সন্তানকেও র‍্যাট রেসের জন্য তৈরি করতেছি আমরা। তার অধিকার আছে তার জীবন ইচ্ছেমতো কাটানোর, কিন্ত আমরা তা কেড়ে নিচ্ছি। পড়শোনা, পড়াশোনা, পড়াশোনা আর প্রতিযোগিতা। সবকিছুতে প্রতিযোগিতা। আর্ট, অ্যাথলেটিক্স, এক্সট্রা কারিকুলাম অ্যাকটিভিটিস, স্পেলিং, ম্যাথ অলিম্পিয়াড, ইংলিশ অলিম্পিয়াড সব চাই সব।

আমরা এতদিন র‍্যাটরেসে দৌড়েছি নিজেদের অজান্তে এক সময় আমাদের সন্তানরাও র‍্যাট রেসে দৌড়াবে নিজেদের অজান্তে। প্রিয় সন্তানকে আমরা অনেকেই হয়তো বলিনি ‘নিজের মতো করে বাঁচো, নিজের মতো জীবনকে গড়ে তোল। আমি তোমার পাশে আছি।'

আসলে এটা কী জীবন? এটাই কী আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য? ছোট্ট একটা জীবনে এভাবেই একটা চক্রে দৌড়াতে দৌড়াতে কাটিয়ে দেওয়ার জন্য জন্মেছি আমরা? জীবন টা এভাবেই শেষ হয়ে যাবে? আর কিছু কি করার নেই জীবনে? প্রশ্ন রইলো আপনাদের কাছে।

মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় লেখাসমূহ