সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

সাম্প্রতিক লেখাসমূহ

ম্যাচিউরিটি X শাওন সিকদার

ম্যাচিউরিটি হচ্ছে যখন আপনি উপলব্ধি করতে পারবেন যে "মানুষ মূলত এক"। হ্যা বুঝতে পারছি আপনার অনেক বন্ধুবান্ধব আছে যারা আপনাকে জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসে, আপনার জন্য সব ধরনের স্যাক্রিফাইস করতে প্রস্তত, আপনার একজন প্রেমিকা আছে যে আপনাকে সত্যিকারের ভালোবাসে, লয়ালটির দিক থেকে সে অতুলনীয়, আপনার জীবনে থাকার লিস্টে বলার মতো এমন বহু আইটেম আছে, তবুও আমি ঘুরেফিরে একই কথা বলবো, " মানুষ মূলত একা "। সাধারনত মানুষ ম্যাচিউরিটি বলতে কী বুঝে? ফেসবুকীয় আবেগী লেখকদের দাঁড়িপাল্লায় যখন আপনি মাপবেন তখন হয়তো নিজের একাকীত্ব নিজের দুর্ভাগ্য গুলোকে চুপচাপ মেনে নেওয়াকেই ম্যাচিউরিটি বলে। আপনার ফ্যামিলির কাছে হয়তো আপনার জীবনের যাবতীয় দুঃখ গুলোকে কবর দিয়ে হাসিমুখে তাদের ভরন পোষন করতে পারাটাই আপনার ম্যাচিউরিটি। আপনার বন্ধুদের কাছে হয়তো আপনার পারিবারিক ব্যেক্তিগত সমস্যাগুলো মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে তাদের সাথে তাল মিলিয়ে আড্ডা দিতে পারাটাই ম্যাচিউরিটি। আপনার স্কুলের টিচারের কাছে হয়তো তাদের কথায় উঠবস করাটাই ম্যাচিউরিটি, পাশের বাড়ির আন্টির কাছে হয়তো আপনার বুয়েট মেডিকেল এ চান্স পাওয়াটাই ম্যাচিউরিটি। প্রে...

২১ ফেব্রুয়ারি? একটি প্রশ্ন আছে! - শাওন সিকদার

 একটা জিনিস লক্ষ করেছেন? আমরা ২১ ফেব্রুয়ারিতে যত ধরনের পোস্টার কিংবা ব্যানার দেখি অথবা যত ধনের লেখালেখি, টাইপোগ্রাফি ইত্যাদি সব যায়গায় একটা কথা লেখা থাকে।

"সকল ভাষা শহিদদের জন্য বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।"

এই যায়গায় আমার একটা প্রশ্ন আছে! প্রথমত ভাষা শহিদ বলতে আমরা কাদের বুঝি? এই বিষয়টা আগে ক্লিয়ার করি। আমরা অধিকাংশ ই ভাষা শহিদ বলতে সালাম, রফিক, জব্বার, শফিউরসহ আরও কয়েকজন কে বুঝি। এই পর্যন্ত মোট আট জন ভাষা শহিদের নাম আমরা জানি।কি প্রকৃত সংখ্যা আরো অনেক বেশি।

১৯৫২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি শনিবার প্রকাশিত ভাষা আন্দোলনের অন্যতম পত্রিকা ‘সৈনিক’-এর প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘শহীদ ছাত্রদের তাজা রক্তে রাজধানী ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত’। খবরে বলা হয়েছে, মেডিকেল কলেজ হোস্টেলে ছাত্র সমাবেশে নির্বিচারে পুলিশের গুলিবর্ষণ বৃহস্পতিবারেই ৭ জন নিহত।'

এছাড়াও দৈনিক আজাদের ওই সময়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে ২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারি গুলিতে ৯ ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছিল। বহু লাশ গুম করে ফেলা হয়েছিল।

অথচ আমরা এখনো কেবলমাত্র ৮ জন ভাষাশহিদের নাম জানি! স্বাধীনতার এত বছর পরেও সম্ভব হয় নি ভাষা শহিদ দেত সঠিক ভাবে শনাক্ত করে তাদেরকে বা তাদের পরিবার কে সম্মানিত করা।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির সন্ধ্যায় সীমান্ত পত্রিকার অন্যতম সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম চৌধুরী ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি’ শিরোনামে একটি দীর্ঘ কবিতা লেখেন।

কবিতার প্রথম কয়েকটি লাইন ছিল এ রকম:

ওরা চল্লিশজন কিংবা আরও বেশি

যারা প্রাণ দিয়েছে ওখানে রমনার রোদ্রদগ্ধ

কৃষ্ণচূড়া গাছের তলায়...

চল্লিশটি তাজা প্রাণ আর অঙ্কুরিত বীজের খোসার মধ্যে

আমি দেখতে পাচ্ছি তাদের অসংখ্য বুকের রক্ত...’

উল্লেখিত কবিতায় কবি যে ৪০ সংখ্যাটি ব্যবহার করেছেন, তা কি শুধু কবিতার জন্য, নাকি এটি সত্য?

কেউ কেউ তাদের বইয়ে উল্লেখ করেছে শহিদ হয়েছেন প্রায় ২৬ জন। যাদের লাশ গুম করে ফেলা হয়েছে। ফলস্বরূপ বলেন আর সরকারের সুদৃষ্টির অভাব বলেন এখনো আমরা ভাষা শহিদদের তালিকা পাই নি।

আর সরকার সু দৃষ্টি দিলেও বা কি হবে! সরকার যদি খোজ নেওয়া শুরু করে, তালিকা করা শুরু করে ভাষা শহিদদের, দেখা যাবে সব ভাষা শহিদ আওয়ামিলীগ নেতাদের বাপ চাচারা ছিলো!

যাই হোক ভাষা শহিদদের এত ত্যাগ এর বিনিময়ে আমরাও তাদের সম্মান দিচ্ছি যে,

"বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা সকল ভাষা শহিদদের জন্য।"

কিন্ত আপনারা যেটা জানেন না সেটা হলো ১৯৫২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি শনিবার প্রকাশিত ভাষা আন্দোলনের অন্যতম পত্রিকা ‘সৈনিক’-এর প্রতিবেদনে আরেকটা কথাও বলা হয়েছিলো। খবরে মেডিকেল কলেজ হোস্টেলে ছাত্র সমাবেশে নির্বিচারে পুলিশের গুলিবর্ষণ বৃহস্পতিবারেই ৭ জন নিহত। সাথে এটাও বলা হয়েছিলো যে "৩ শতাধিক আহত।"

আমার কথাটা এখানেই। এইযে আহত শ্রেণির কিছু মানুষ। যারা ভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়েছে তাদেরকে আমরা ভুলে যাই। এটা কি আসলে ঠিক?

আপনারা জানেন ভাষা আন্দোলনের একদম শুরুর দিকটা কীভাবে এসেছিলো? মানুষ কীভাবে সোচ্চার হলো ভাষা নিয়ে? জানেন না তো? এটা হচ্ছে লেখালেখি।

ভাষা আন্দোলনের আদিপর্ব অর্থাৎ এর তাত্ত্বিকপর্বে লেখক-সাংবাদিক আবদুল হক ও মাহবুব জামাল জাহেদী প্রমুখের লেখা এবং ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, ড. এনামুল হক প্রমুখের রচনাদি ছিল যুক্তিসজ্জিত। কিন্ত কখনো শুনেছেন তাদের জন্য বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রকাশ করতে?

আপনারা জানেন ২১ ফেব্রুয়ারিতে কিন্ত ভাষা আন্দোলন শেষ হয়ে যায় নি! এইদিনে কিন্ত আমাদের বাংলা ভাষার স্বীকৃতি আসেনি। রফিক, শফিক, জব্বার এর মতো মানুষ আন্দোলনে শহিদ হয়েছিলো। আপনি কি জানেন যে এভাবে পুলিশের গুলিতে মারা যাওয়ার ঘটনা হওয়ার পরেও একদল মানুষ ছিলো যারা দমে যাননি। তীব্র ভাবে আন্দোলন চালিয়েই গেছেন। ২২ ও ২৩ ফেব্রুয়ারি ছাত্র, শ্রমিক, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক ও সাধারণ জনতা পূর্ণ হরতাল পালন করে এবং সভা-শোভাযাত্রাসহকারে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে। ২২ ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে শহীদ হন শফিউর রহমান শফিক, রিক্সাচালক আউয়াল এবং অলিউল্লাহ নামক এক কিশোর। ২৩ ফেব্রুয়ারি ফুলবাড়িয়ায় ছাত্র-জনতার মিছিলেও পুলিশ অত্যাচার-নিপীড়ন চালায়। এ নির্লজ্জ, পাশবিক, পুলিশি হামলার প্রতিবাদে মুসলিম লীগ সংসদীয় দল থেকে সেদিনই পদত্যাগ করেন। ভাষা আন্দোলনের শহীদ স্মৃতিকে অম্লান করে রাখার জন্য মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে রাতারাতি ছাত্রদের দ্বারা গড়ে ওঠে শহীদ মিনার, যা ২৪ ফেব্রুয়ারি উদ্বোধন করেন শহীদ শফিউর রহমানের পিতা। ২৬ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে শহীদ মিনারের উদ্বোধন করেন দৈনিক আজাদ পত্রিকার সম্পাদক জনাব আবুল কালাম শামসুদ্দীন। আচ্ছা এদের কারো কী জীবনের ঝুকি ছিলো না? এদের সবারই তো প্রাণ হানীর ঝুকি ছিলো! এদের মতো অনেক ভাষা সৈনিক আছে যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে ভাষা আন্দোলনে অংশ নেয়। সবার কথা জানা হয়তো আমাদের পক্ষে সম্ভব ও না যারা জীবনের ঝুকি নিয়ে ভাষা আন্দোলনকে বেগ দিয়েছে। আচ্ছা তারা কী সম্মানের প্রাপ্য না। মানে ভাষা শহিদদের সাথে তাদেরকেও কি বিনম্র ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা দেওয়া যায় না?

একটা বিষয় ক্লিয়ার করি আমি কখনোই বলছি না যে ভাষা শহিদ দের সম্মান দেওয়া যাবে না। তারা দেশের জন্য আত্মত্যাগ করেছে। তাদেরকে অবশ্যই সম্মান দিতে হবে। আর সেই সম্মান শুধু ২১ ফেব্রুয়ারিতে না, সারা বছর, সারাজীবন দিতে হবে। তারা সম্মান পাচ্ছে আর সম্মানের প্রাপ্য ও তারা। কিন্ত এই যে একটা বিশাল শ্রেণি যাদের আমরা ভুলে যাচ্ছি। তারাও কিন্ত সম্মানের দাবিদার। আমরা যদি বলি "সকল ভাষা শহিদদের জন্য বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা" তাহলে শুধুই ভাষা শহিদদের জন্য ভালোবাসা প্রকাশ হলো। বিশাল একটা শ্রেণি যাদেরকে আমরা ভুলেই গেলাম।এমনিতেই ইতিহাস যেভাবে বিকৃত হচ্ছে, আমাদের কয়েক প্রজন্ম পর হয়তো বাঙালীর ইতিহাস বলতে শুধু গুটি কয়েক মানুষের নামই জানবে। এই ইতিহাস কে একই সাথে সম্মানিত ও সংরক্ষণ করার দ্বায়িত্ব ও আমাদের ই। ভাষা শহিদেরা যদি জীবন দিয়ে থাকে ভাষা সৈনিকেরাও জীবন বাজি রেখে ভাষার জন্য লড়েছে। এজন্য আমাদের এভাবে বলা উচিৎ না যে "সকল ভাষা শহিদদের জন্য বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা" তাহলে কেবলি শহিদরা সম্মান পেলো। বিশাল একটা অংশ বাদ পরে গেলো। সবসময় বলবো যে " সকল ভাষা সৈনিকদের জন্য বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা" তাহলে একই সাথে ভাষা সৈনিক, ভাষা শহিদ সবার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করা হবে।

ধন্যবাদ।

শাওন সিকদার

২২-২-২২

মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় লেখাসমূহ