সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

সাম্প্রতিক লেখাসমূহ

ম্যাচিউরিটি X শাওন সিকদার

ম্যাচিউরিটি হচ্ছে যখন আপনি উপলব্ধি করতে পারবেন যে "মানুষ মূলত এক"। হ্যা বুঝতে পারছি আপনার অনেক বন্ধুবান্ধব আছে যারা আপনাকে জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসে, আপনার জন্য সব ধরনের স্যাক্রিফাইস করতে প্রস্তত, আপনার একজন প্রেমিকা আছে যে আপনাকে সত্যিকারের ভালোবাসে, লয়ালটির দিক থেকে সে অতুলনীয়, আপনার জীবনে থাকার লিস্টে বলার মতো এমন বহু আইটেম আছে, তবুও আমি ঘুরেফিরে একই কথা বলবো, " মানুষ মূলত একা "। সাধারনত মানুষ ম্যাচিউরিটি বলতে কী বুঝে? ফেসবুকীয় আবেগী লেখকদের দাঁড়িপাল্লায় যখন আপনি মাপবেন তখন হয়তো নিজের একাকীত্ব নিজের দুর্ভাগ্য গুলোকে চুপচাপ মেনে নেওয়াকেই ম্যাচিউরিটি বলে। আপনার ফ্যামিলির কাছে হয়তো আপনার জীবনের যাবতীয় দুঃখ গুলোকে কবর দিয়ে হাসিমুখে তাদের ভরন পোষন করতে পারাটাই আপনার ম্যাচিউরিটি। আপনার বন্ধুদের কাছে হয়তো আপনার পারিবারিক ব্যেক্তিগত সমস্যাগুলো মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে তাদের সাথে তাল মিলিয়ে আড্ডা দিতে পারাটাই ম্যাচিউরিটি। আপনার স্কুলের টিচারের কাছে হয়তো তাদের কথায় উঠবস করাটাই ম্যাচিউরিটি, পাশের বাড়ির আন্টির কাছে হয়তো আপনার বুয়েট মেডিকেল এ চান্স পাওয়াটাই ম্যাচিউরিটি। প্রে...

গল্পঃ ঈদ লেখাঃ শাওন সিকদার

 সকাল থেকে রাগ করে জানালার পাশে বসে আছে ছোট্ট রিনা। সারাদিন একটা ভাত ও মুখে তুলে নি সে। উদাস চোখে মেঘলা আকাশের পানে তাকিয়ে আছে অবিরাম। এইবারে ঈদ ও হয়তো তাকে সেই পুরোনো জামা পড়েই কাটাতে হবে। কাল ঈদ, অথচ সকাল পেরিয়ে রাত হয়ে গেছে তাও বাবা এখনো নতুন জামা নিয়ে আসে নি। পাশের বাড়ির সুমাইয়া নতুন জামার সাথে জুতাও কিনেছে, কিন্ত কতদিন হলো রিনা সেই এক জোড়া জামা অদল বদল করে পড়ে আসছে। মাঝে মাঝে রিনার মনে হয়," বোধহয় আমার কপালই খারাপ। এজন্যই এমন বাপের ঘরে জন্ম নিছি। আমার বন্ধুরা সবাই প্রত্যেক ঈদে নতুন নতুন জামা পড়ে, শুধু আমার কপালটাই খারাপ।" 


রাত প্রায় ১২ টা ছুই ছুই, এমন সময় সশব্দে রিক্সাটা এসে বাড়ির দরজায় থামলো। রিনার মা আমেনা বেগম সেই সন্ধ্যা থেকে বসে আছে স্বামী জব্বার মিয়ার আসার অপেক্ষায়। রিক্সার শব্দে রিনা আর রিনার মা দুজনেই ছুটে এলো দরজায়। এসেই রিনার ঠোঁটে এক চিলতে হাসি দুটে উঠলো। ঈদের বাজার সদাই এর সাথে সাথে রিনা আর রিনার মায়ের জন্য নতুন পোশাক ও নিয়ে এসেছে জব্বার মিয়া। রিনা দৌড়ে গিয়ে ঈদের জামা টা ছিনিয়ে নিলো বাবার হাত থেকে। নিয়েই এক দৌড়ে নিজের রুমে চলে গেলো জামাটা পড়ে দেখার জন্য। মেয়ের এমন বাচ্চামো দেখে জব্বার মিয়া খানিকটা হেসে উঠলো। 



হাত মুখ ধুয়ে তাড়াহুড়ো করে খেতে বসেছে জব্বার মিয়া। সারাদিন রিক্সা চালিয়ে তার শরীর এখন অবশ হয়ে আসছে। কাল আবার সকাল সকাল বেরোতে হবে, ঈদের দিন ভাড়া বেশি পাওয়া যায়। আমেনা বেগম অনেক্ষন যাবৎ  একটা একটা প্রশ্ন করবে করবে করেও করতে পারছে না। খানিক্ষন ইতস্তত করার পর জিজ্ঞেস করেই ফেললো,

" আমনের জন্য কিছু কিনেন নাই?" জব্বার মিয়া মুচকি হেসে বললো,

" আমার লইজ্ঞা আর কি কিনুম? আমার কি আর এখন কিনার বয়স আছে? তোমাগো ঈদ ই আমার ঈদ! মাইয়াডারে গত ঈদেও দিতে পারিনাই কিছু!"


আমেনা বেগম দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো," পায়ের ব্যাথায় তো দাড়াইতে পারেন না। একজোড়া জুতা নিয়েন ভালো দেইক্ষা!"


জব্বার মিয়া আমেনার কথার জবাব না দিয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে আছে। রিনা তার জামা টা নিয়ে ফিরে আসছে। রিনার করুন চাহনি দেখে জব্বার মিয়া আন্দাজ করতে পেরেছে কি হয়েছে। তাও একটু হাস্যোজ্জ্বল হওয়ার চেস্টা করে জিজ্ঞেস করলো,

" কী হইসে মা?" রিনা টলমল চোখে জবাব দিলো,

" এইডা কী জামা আনছো বাজান? পাশের বাড়ির সুমাইয়া কত্ত সুন্দর জামা কিনছে সুমাইয়ার বাপ ওরে নতুন জুতাও কিন্না দিছে। আর আমার লইজ্ঞা এইডা কি নিয়া আইছো?"

বেচারা জব্বারের মুখখানা ফ্যাকাশে হয়ে গেলো।ছেড়া জুতা পড়ে, পায়ের প্রচন্ড ব্যাথা নিয়ে, সারাদিন রিক্সা চালিয়ে এরচেয়ে বেশি সে জোগাড় করতে পারে নি। এটুকুই যে সামর্থ্য ছিলো তার। কিন্ত তার এই ছোট্ট মেয়েকে কে বুঝাবে সেই কথা। আমেনা বেগম মেয়েকে বুঝ দেওয়ার চেস্টা করলো,

"কী হইছে মা? জামা তো সুন্দর ই আছে। তুমি পড়ো তোমারে দেখবা পরীর মতো লাগবো!" 

রিনা টলমল চোখে খানিক ক্রোধান্বিত হয়ে জামাটা জব্বারের পাশে রেখে দিয়ে বললো," তোমাগো জামা তোমরাই পড়ো।" বলে চোখ মুছতে মুছতে নিজের রুমে চলে গেলো। জব্বার অসহায়ের মতো নিশ্চুপ হয়ে অপলক তাকিয়ে আছে রিনার চলে যাওয়ার দিকে। দু চোখের কোনে খানিক অনুতাপ তার পানি হয়ে এসেছে। জব্বারের তার বাবার কথা মনে পড়ে গেছে। সেও তখন রিনার বয়সী ছিলো। মনে আছে এক ঈদে জামা কিনে না দেওয়ায় সে পুরো বাড়ি কেমন মাথায় তুলে নিয়েছিলো। সেদিন তার বাবা কেমন অসহায়ের মতো বলেছিলো," আমার কাছে টাকা নাইরে বাপ!" জব্বার আজ নিজে বাবা হওয়ার পর বুঝতে পারছে, তার বাবার মূল্য। দু চোখের কোনে জমে যাওয়া নোনতা দু ফোটা জল গড়িয়ে গড়িয়ে এসে খাবারের মাঝে পড়লো। আমেনা বেগম নির্বাক হয়ে তাকিয়ে আছে জব্বারের দিকে। এত্ত শক্ত একটা মানুষ জব্বার, বিয়ের পর থেকে জব্বারের চোখে পানি সে খুব কমই দেখেছে। ছেড়া লুঙ্গীটার এক কোনা দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে খেতে লাগলো জব্বার। খানিক পরেই মিন মিন করে বলে উঠলো," আমারে মাফ কইরা দিও বাজান! মাফ কইরা দিও!"




গল্পঃ ঈদ

লেখাঃ শাওন সিকদার 

৯/৭/২২

মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় লেখাসমূহ