সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

সাম্প্রতিক লেখাসমূহ

ম্যাচিউরিটি X শাওন সিকদার

ম্যাচিউরিটি হচ্ছে যখন আপনি উপলব্ধি করতে পারবেন যে "মানুষ মূলত এক"। হ্যা বুঝতে পারছি আপনার অনেক বন্ধুবান্ধব আছে যারা আপনাকে জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসে, আপনার জন্য সব ধরনের স্যাক্রিফাইস করতে প্রস্তত, আপনার একজন প্রেমিকা আছে যে আপনাকে সত্যিকারের ভালোবাসে, লয়ালটির দিক থেকে সে অতুলনীয়, আপনার জীবনে থাকার লিস্টে বলার মতো এমন বহু আইটেম আছে, তবুও আমি ঘুরেফিরে একই কথা বলবো, " মানুষ মূলত একা "। সাধারনত মানুষ ম্যাচিউরিটি বলতে কী বুঝে? ফেসবুকীয় আবেগী লেখকদের দাঁড়িপাল্লায় যখন আপনি মাপবেন তখন হয়তো নিজের একাকীত্ব নিজের দুর্ভাগ্য গুলোকে চুপচাপ মেনে নেওয়াকেই ম্যাচিউরিটি বলে। আপনার ফ্যামিলির কাছে হয়তো আপনার জীবনের যাবতীয় দুঃখ গুলোকে কবর দিয়ে হাসিমুখে তাদের ভরন পোষন করতে পারাটাই আপনার ম্যাচিউরিটি। আপনার বন্ধুদের কাছে হয়তো আপনার পারিবারিক ব্যেক্তিগত সমস্যাগুলো মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে তাদের সাথে তাল মিলিয়ে আড্ডা দিতে পারাটাই ম্যাচিউরিটি। আপনার স্কুলের টিচারের কাছে হয়তো তাদের কথায় উঠবস করাটাই ম্যাচিউরিটি, পাশের বাড়ির আন্টির কাছে হয়তো আপনার বুয়েট মেডিকেল এ চান্স পাওয়াটাই ম্যাচিউরিটি। প্রে...

গল্পঃ এপিঠ ওপিঠ লেখাঃ শাওন সিকদার

 -- "তুই একটা ছ্যাচড়ার সাথে প্রেম করিস, তোর বয়ফ্রেন্ড একটা ছোটলোক। দেখ রাগ করিস না, আমার মনে হয় না সুজন কোন ভালো ছেলে। আরেকবার ভেবে দেখ সামিয়া। এমন ভোলাভালা চেহারার ছেলে গুলোই প্লে বয় হয়। এত ভালোবাসা দেখানো ছেলেগুলো ভালো হয় না। ভালোবাসার বেলায় আছে টাকার বেলায় নেই। ডেটে গেলেও প্রতিবার তোর সব টাকা দেওয়া লাগে। সবকিছু পানির মতো পরিষ্কার, তারপরেও কেন বুঝছিস না এই ছেলে টাকা খাওয়ার ধান্দায় আছে। "


সামিয়া প্রচন্ড ভালোবাসে সুজন কে। এসব কথায় তার বুক কেপে কেপে উঠে। বেশ কদিন ধরেই বান্ধবীরা বুঝাচ্ছে তাকে। সুজনের বন্ধু কয়েকজনের নামে মেয়ে কেলেঙ্কারির অভিযোগ আছে। সুজন ও কী এমন? সামিয়া চিন্তায় পড়ে গেলো। ইন্তিয়া পাশে থেকে বললো,

-- "ছয় মাসের রিলেশনে তোর বয়ফ্রেন্ড একটা শাড়িও গিফট করে নি। একটা শাড়ি দাম আর কত? ছয় সাতশ টাকা? আমার বয়ফ্রেন্ড প্রতি মাসে কিছু না কিছু গিফট দেয়। তোর জন তোকে ৫০ টাকার ফুচকাও খাওয়াইতে পারে না? শুধু তোর থেকে খাওয়ার ধান্দায় থাকে। নিজের হাতে নিজের ভবিষ্যৎ ধংশ করিস না সামিয়া, সময় থাকতে সব শুধরে নে।"

বেশ কিছুদিন ধরে সামিয়া ভাবছে ব্যাপারগুলো নিয়ে। আসলেই কি করবে ও? সুজনের সাথে ওর যায় না আসলে। সুজনের সাথে থাকলে ওর বাকি জীবন কষ্টে কষ্টেই কাটবে। সুজন হয়তো অতটা ভালো ছেলেও না, মাঝে মাঝে ১০/২০ টাকার বাইরে একটা টাকাও খরচ করে নি ওর পেছনে। কদিন পরে পরেই ব্রেকাপ করে কোথায় যেন হারিয়ে যায়। আবার এসে কান্নাকাটি করে ঠিক করে।

--" দেখ এতো ভেবে কোন লাভ নেই তুই ওর থেকে অনেক ভালো ছেলে পাবি। ইউ ডিজার্ভ বেটার। কেন নিজের ভবিষ্যৎ ঝুকির মধ্যে ফেলছিস?"

এমন ছেলের সাথে কোন ভবিষ্যৎ নেই সামিয়ার। সামিয়া তার ডিসিশন নিয়ে নিলো!

-------------

প্রচন্ড বর্ষার মাঝে সামিয়ার কলেজের গেটে দাঁড়িয়ে আছে সুজন। কান্নাভেজা চোখে সামিয়ার দিকে তাকিয়ে শেষ বারের মতো বললো,

--" সামিয়া! আরেকটা বার ভেবে দেখো। তুমি হয়তো ভুল করছো। পরে হয়তো আফসোস করবা কিন্ত তখন কোন লাভ হবে না। কিন্ত আমি আমার লক্ষীটাকে আজীবনের জন্য হারিয়ে ফেলবো। আমি তোমাকে হারাতে চাই না। একটাই তো জীবন বলো, প্রিয় মানুষটাকে না পাওয়ার আফসোস নিয়ে মরতে চাই না। আরেকটাবার ভেবে দেখো প্লিজ। "

সামিয়া ব্রেকাপ করার একটা অযুহাত পেয়েছে, এই সুযোগে সে হাতছাড়া করবে বা। এবার সে ব্রেকাপ করেই ছাড়বে। যতই কান্নাকাটি করুক এই রিলেশন আর রাখবে না সে। সামিয়া বললো,

-- "দেখো সব তো শেষ করে চলেই গিয়েছিলে। তাহলে আবার ফেরত আসলে কেন? সব শেষ তো শেষ, আর ঠিক হবে না। আমিও এখন বদলে গেছি। আমার পক্ষে আর এই রিলেশন রাখা সম্ভব না। "

বৃষ্টির সাথে ঝড়ছে সুজনের চোখের জল, কিন্ত বুঝা যাচ্ছে না। তার মুখের দিকে তাকালে বুঝার অবকাশ নেই সে কান্না করছে। সামিয়াকে বললো,

-- "সামিয়া আমি ইচ্ছে করে ব্রেকাপ করিনি, তুমি ভুল বুঝতেছো। আমি চাই তুমি একটু চেঞ্জ হও। তুমি সবসময় এতটা খামখেয়ালি থাকো, আমারো তো ইচ্ছে করে আমাকে কেউ ভালোবাসুক। এমন না যে এটা প্রথমবার হয়েছে, এর আগেও তো এমন হয়েছে।"

-- " বাহ ভালো বুদ্ধি। এখন এসব বলে আর কোন লাভ নেই সুজন। সম্পর্ক শেষ তো শেষ। আমি আর এই সম্পর্কে ব্যাক করতে চাই না।" বলেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো সামিয়া। যাক কোন একটা অযুহাত দেওয়া গেলো সম্পর্ক শেষ করার জন্য। সামিয়া কলেজের ভেতরে চলে যাচ্ছে তার বান্ধবীদের নিয়ে। সুজন বর্ষার ভেতর বাইরে দাঁড়িয়ে অপলক তাকিয়ে আছে সামিয়ার চলে যাওয়ার দিকে।

খানিক পরে সুজন হাটা ধরলো রুমের উদ্দেশ্যে। বর্ষার মাঝে যাচ্ছে আর সামিয়ার কলেজের দিকে তাকাচ্ছে। হয়তো ফিরে এসে বলবে, "যেওনা, ভালোবাসি।" আবার হাসিও পাচ্ছে, সুজন জানে এটা কখনোই হবে না। ভালোবাসা ইদানীং অনেক সস্তা হয়ে গেছে। একটু পরেই তার মোবাইল টা ভাইব্রেশন করে উঠলো। রাস্তার পাশে চায়ের দোকানে গিয়ে পকেট থেকে পলিথিন পেচানো মোবাইল টা বের করলো, বাড়ি থেকে মা কল দিয়েছে। সুজন একটু দম নিলো, এরপর রিসিভ করলো। ওপাস থেকে মা বললো,

-- " হ্যালো সুজন। কেমন আছিস বাবা?"

-- "ভালো আছি মা। তুমি কেমন আছো?"

-- " এইতো আছি রে বাবা। একটু অসুস্থ আরকি। বা পাশের পা টা কেমন যেন অবশ হয়ে আসে। শ্বাস আটকে আসে মাঝে মাঝে। কি যে করি বল। প্রেশার অনেক লো হয়ে গেছে। মনে হয় বাচবো না বেশিদিন। আচ্ছা শুন তোর কাছে কি টাকা আছে? তোর বোনের স্কুলে ফী দিতে হবে। নইলে পরীক্ষা দিতে দিবে না।"

-- "না মা। আমার কাছে তো টাকা নেই।"

-- "আচ্ছা বাবা সমস্যা নেই। আমি ম্যানেজ করে নিবো টাকা। দেখি তোর ফুফুদের কাছ থেকে চাইতে হবে। তুই কোন চিন্তা করিস না ভালো করে পড়াশোনা কর। ঠিকমতো খাইস বাবা। রাখি।"

সুজন চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। সে জানে এরপর কি হবে। ফুফুদের কাছে টাকা চাইতে গিয়ে তার মা কে আজেবাজে অনেক কথা শুনতে হবে। অপমানিত হয়ে মুখ বুঝে সহ্য করে একটা আশা বুকে নিয়ে ফিরে আসবে। সেটা হলো তার ছেলে ভার্সিটি শেষ করে ভালো চাকরি করবে। এরপর সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। মাত্র কয়েক হাজার টাকার জন্য তার মা ডাক্তার দেখাতে পারছে না। একমাত্র বোনের কোন খোজ নেয় না সে লজ্জায়। তার বাবাও তো এভাবেই মারা গিয়েছিলো। টাকার অভাবে চিকিৎসা না করে। তার মা ও চোখের সামনে ধুকে ধুকে মরছে। ছোট্ট বোনের এমন মানবেতর জীবন যাপন দেখে অসহ্য যন্ত্রণা হয় তার। প্রচন্ড জোড়ে চিৎকার করে সামিয়াকে বলতে ইচ্ছে করে,

"একটু বুঝো আমায়, একটু বুঝো। একটু সময় দেও। কি হতো আমাকে একটু বুঝলে?" 'আমাকে যদি একটু বুঝতো' নামক করুন একটা আফসোসে বুক ফাটিয়ে হাহাকার করতে ইচ্ছে করছে তার।

হয়তো রিক্সায় করে পুরো ঢাকার শহর ঘুরালে সামিয়ার রাগ ভাঙতো। তথাকথিত প্রেমিকদের মতো প্রচুর সারপ্রাইজ গিফট পাঠিয়ে দিলে বুঝতো সুজনের তাকে কত ভালোবাসে। কিন্ত সুজনের সেই সামর্থ নেই। একবার সামিয়ার পেছনে ৫০০ টাকা খরচ করার পর পুরো এক সপ্তাহ না খেয়ে ছিলো সে। প্রচন্ড খুদায় রুমের এক কোনে বসে কান্না করেছিলো লুকিয়ে লুকিয়ে। বন্ধুদের থেকে ধার চাইতে পারেনি লজ্জায়। অনেক টাকা ধার নেওয়া শেষ। এসব গল্প সামিয়ার অজানা। হয়তো অনেক টাকা থাকলে আজ অনেক গিফট নিয়ে এসে সামিয়ার রাগ ভাঙানো যেতো, রিক্সায় পুরো শহর ঘুরে প্রেমিক হওয়া যেতো। টাকার অভাবে ভালোবাসি শব্দটা জোর দিয়ে বলার ক্ষমতা নেই তার।

পাশেই থাকা চায়ের দোকানে কেউ একজন গান ছেড়ে দিয়েছে। গানের শব্দে সুজনের ঘোর ভাঙলো। গান বাজছে,

"আমি এক গরিব প্রেমিক নীলা,
আমার আর কিচ্ছু করার নেই।
আমি এক বেকার প্রেমিক নীলা,
তোমাকে কিচ্ছু দেবার নেই..
একটা নীল জোছনা রাতে,
এক মুক্ত আকাশ সাথে,
শান্ত শীতল শহরে দুজনেই.."

সুজন উঠে দাড়ালো। সন্ধে হয়ে গেছে, এবার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিতে হবে। হেটে বাড়ি যেতে হবে তাকে। বাড়ির পথ অনেক দূর। গাড়িতে যাওয়ার ভাড়া নেই তার কাছে। না আছে তার নীলাকে ধরে রাখার ক্ষমতা। না আছে নীলাকে দেওয়ার মতো কিছু। কিছুই নেই তার, শুধু কান্না লুকানোর ক্ষমতা ছাড়া।

গল্পঃ এপিঠ ওপিঠ
লেখাঃ শাওন সিকদার

মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় লেখাসমূহ