-- "এ এই নীলা এদিকে তাকাও। আমার চোখের দিকে তাকাও। হ্যা আমার দু চোখে দেখো। এই দু চোখে না তুমি তোমার দুনিয়া দেখতে? বলতে না আমার চোখের দিকে তাকিয়ে নাকী আজীবন থেকে যাওয়া যায়? কই কই তোমার চোখের সেই আবেগ কই নীলা? এত ভয় পেয়ে আছো কেন?"
অনেক্ষন ধরে হা করে নির্বাক হয়ে আছে নীলা। প্রচন্ড ভীতি সঞ্চার হওয়া দুটো চোখে অপলক দেখছে ইরাদ কে।
-- "নীলা, এই নীলা। কথা বলো না কেন? তোমার চোখের ভালোবাসা কই নীলা? নীলা ওই নীলা আমার না বুক টা ফেটে যাচ্ছে। আমার ভালোবাসা কীভাবে হারাইলো নীলা? হায় আল্লাহ......"
আকাশ বাতাস এক করে ইরাদের দেওয়া গগন বিদারী চিৎকার বাইরে ফোর্স নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশ অফিসার নাজমুল হোসেনের কান এড়ায় নি। এমন চিৎকারের শব্দ শুনে আরেকটু সতর্কভাবে অবস্থান নিলেন তিনি। সেই সকালে পাগলাগারদ থেকে পালিয়েছে ইরাদ। সকাল থেকে তন্ন তন্ন করে খুজেও পাওয়া যাচ্ছিলো না ইরাদ কে। নীলার বাসায় সকাল থেকে পাগলের মতো চিৎকারের শব্দ শুনে প্রতিবেশীরা পুলিশকে ফোন করে, এরপরেই ভাগ্যক্রমে ইরাদের অবস্থান টের পায় পুলিশ। মাইক উচু করে নাজমুল হোসেন আবার বলেন,
-- "ইরাদ তুমি যা চাও সব ব্যবস্থা আমি করে দিবো। তুমি এখন বের হও, নাহলে আমি ভেতরে আসতে বাধ্য হবো!"
ভেতর থেকে ইরাদ বললো,
-- "স্যার আমাকে আর অল্প একটু সময় দেন। নীলার সাথে আমারে একটু থাকতে দেন স্যার, আমি চলে আসবো। আমার নীলারে একটু দেখি স্যার, দশটা বছর ধরে দেখি না স্যার। একটু দেখতে দেন।"
নীলার অপলক চোখ ফ্যাকাশে হয়ে আসছে। তবুও সে নির্বাক। ইরাদ প্রচন্ড অভিমানি কন্ঠে আবার জিজ্ঞেস করলো,
-- "লক্ষী, আমার লক্ষী। এটা কেন করলা বলো? আমি তো চাকরি খুজতেছিলাম বলো। তুমি আমারে না বলে বিয়ে করে নিবা এজন্য? জানো তুমি যাওয়ার পরে মানুষ আমারে পাগল বলে হাসপাতালে এনে বেধে রাখছে। লক্ষী তুমি বলো আমি কী পাগল? ওই নীলা কথা বলো না কেন?"
বাইরে থেকে নাজমুল হোসেন আবার হস্তক্ষেপ করলো,
-- "ইরাদ এবার কিন্ত আমি ভেতরে আসবো, এর ফলাফল কিন্ত ভালো হবে না। তুমি বের হও ইরাদ, আমি তোমার সাথে নীলার কথা বলিয়ে দিবো!"
দরজা ধাক্কানোর শব্দে ইরাদের বুক কেপে উঠলো৷ তার অনেক কিছু বলার আছে নীলাকে। আবার আহাজারি করে বলে উঠলো,
-- "স্যার আর একটু সময় দেন স্যার। একটু দেখি আমার লক্ষীরে। এই নীলা চুপ করে আছো কেন? জানো হাসপাতালে থেকে শুনছি কারা যেন আমার ছোট বোনটারে ধ-র্ষ-ন করে আধমরা ফেলে রেখে গেছে। আমার বোনটা নাকি ভাইয়ারে খুজছে নীলা, আমার বোন আমারে খুজছে! আমার মা নাকি ওইটা দেখেই মারা গেছে। আমি থাকতে আমার মা বোনের এ কেমন পরিনতি বলো। নীলা তুমি কথা বলো না কেন? আমার মা বোনের জন্য তোমার মায়া লাগে না নীলা? আমার তো বুক ফেটে কলিজা বেরিয়ে আসতাছে, নীলা কথা বলো তুমি!"
ইরাদের কান্নার শব্দে বুক ভারী হয়ে আসছে বাইরে দাঁড়ানো নাজমুল হোসেনের। এক খানিক দীর্ঘস্বাস ছেড়ে ফোর্স দের নির্দেশ দিলেন দরজা ভাঙতে। অনেকক্ষন হয়ে গেছে আর এভাবে থাকা সম্ভব না।
-- " শফিক দরজা ভাঙো! আর না এবার এটাই শেষ পথ!"
ভেতর থেকে আসা গগন বিদারী চিৎকার কে উপেক্ষা করে প্রচন্ড জোর খাটিয়ে দরজা ভেঙে ফেললো কনস্টেবল শফিক। দরজা ভাঙার সাথে সাথেই হুরমুর করে ভেতরে ঢুকে পরলেন নাজমুল হোসেন আর তার টিম। ভেতরে এসেই দাঁড়িয়ে গেলো সবাই। কান্নাভেজা চোখে অসহায়ের মতো তাকিয়ে ইরাদ বললো,
--" স্যার এসে গেলেন আপনি। আরেকটু সময় দেন স্যার। আমার নীলারে একটু দেখি। কতদিন দেখি না। আর একটু সময় দেন স্যার!"
বিষ্ফোরিত চোখে তাকিয়ে আছে নাজমুল হোসেন আর তার টিম। পুরো রান্নাঘর রক্তে লাল হয়ে গেছে। একপাশে শান্তভাবে হেলান দিয়ে বসানো নীলার মাথা বিহীন শরীর। চুইয়ে চুইয়ে পরা রক্তে পুরো মেঝে লাল হয়ে গেছে। মাথা বিহীন দেহ টা হাত পা মেলে শান্তভাবে বসে আছে। পুরো মেঝে জুড়ে রক্ত, তার মাঝে নীলার মাথা নিয়ে বসে আছে ইরাদ। মেঝেতে বসে নীলার দেহ থেকে আলাদা হওয়া মাথাটা নিয়ে পাগলের প্রলাপ বকে যাচ্ছে ইরাদ,
--"নীলা কথা বলো! এই নীলা কথা বলো!"
এমন বীভৎস দৃশ্য দেখে বিশালদেহী কনস্টেবল শফিক সেখানেই পেট উলটে বমি করে ফেললো। চক্কর দেওয়া মাথা কোনমতে সামলে নাজমুল হোসেন একটা চেয়ার টেনে বসে পড়লো। ইরাদ এখনো মাটিতে বসে আছে। ইরাদের সাদা পুতুলের মতো চেহারায় ফোটা ফোটা রক্তের ছোপ রক্তখেকো পিশাচের অবয়ব দিচ্ছে। কাটা মাথা থেকে ছিটকে ছিটকে আসা রক্তে ইরাদের পুরো দেহ রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে। কাটা মাথাটা দুহাতে নিয়ে বার বার ঝাকাচ্ছে আর বলছে,
--" নীলা, এই নীলা। কথা বলো না কেন? এভাবে তাকিয়ে আছো কেন? নীলা তোমার চোখে আগের মতো ভালোবাসা নেই নীলা। স্যার আপনারা যান, আমি নীলার সাথে আরেকটু কথা বলি। কতটা বছর পর আমার লক্ষীটারে পাইলাম, একটু মন ভরে দেখি। আপনারা যান স্যার।"
গল্পঃ ক্যাকটাস
লেখাঃ শাওন সিকদার
মন্তব্যসমূহ