-- এই ছেলে তোমার কাছে কয়টা ফুল আছে?
-- এইতো স্যার এহানে যা দেখতাছেন তাই!
-- আচ্ছা দাম কত করে?
-- একটা ২০ টাকা আর তিনটা নিলে ৫০ টাকা!
-- আমার তো ২৫০ টা ফুল লাগবে। দেওয়া যাবে?
-- জি স্যার দেওয়া যাইবো, তয় একটু সময় লাগবো। বাড়িতে যাওয়া লাগবো।
-- আচ্ছা চলো।
বউ নিয়ে এই এলাকায় নতুন এসেছেন রাশেদ সিকদার। এলাকায় এখনো অতটা পরিচিত না তিনি। অফিসে যাওয়ার সময় রাস্তার পাশে বসে বসে ফুল বিক্রি করা রাকিব কে দেখেই পছন্দ হয়েছিলো তার। কেমন নাদুস নুদুস ছেলে, দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। এজন্য রাশেদ সিকদার আগেই ঠিক করে রেখেছিলেন, এবার বিবাহ বার্ষিকীর সময় রাকিবের থেকেই ফুল কিনবেন। পাচ মিনিট হাটার পরেই রাকিবের বাসা চলে আসলো!
-- এই নেন স্যার, এইখানে ২৫০ এর বেশি আছে।
-- না না আমার ২৫০ ফুল ই লাগবে। গুনে দেও।
-- বেশি হইলে সমস্যা নাই স্যার। আপনি ২৫০ ফুলের টাকাই দিয়েন!
-- না না! আমার ২৫০ ফুল ই লাগবে। বেশি লাগবে না।
খানিক বিভ্রান্ত হয়ে গুনে গুনে ২৫০ ফুল গুছিয়ে দিলো রাকিব। টাকা দেওয়ার সময় আমতা আমতা করে রাশেদ সাহেব বললো,
--আচ্ছা রাকিব এতগুলো ফুল নিয়ে আমি একা একা কীভাবে যাবো। আমাকে একটু বাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিতে পারবা?
-- স্যার এখন তো রাত হয়ে গেছে!
-- আমি নাহয় তোমাকে আরো কিছু টাকা দিবো। বেশি দূরে না। একটু হেল্প করো আমার।
-- আচ্ছা স্যার চলেন।
রাস্তায় যাওয়ার সময় দোকান থেকে ৩ প্যাকেট বিরিয়ানি, কেক, মোমবাতি কিনে নিলেন রাশেদ সাহেব। একগুচ্ছ ফুল, কেক, মোমবাতি নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে এগিয়ে চললেন বউকে বিবাহবার্ষিকী উপলক্ষে সারপ্রাইজ দেওয়ার উদ্দেশ্যে। বাড়িতে পৌছানোর পরে কলিং বেল বাজালেন রাশেদ সিকদার। খানিক পরেই দরজা খুলে দিলো তার বউ!
রাশেদ সাহেব বউকে জড়িয়ে ধরে একগুচ্ছ ফুল উপহার দিয়ে বললো,
-- শুভ বিবাহ বার্ষিকী!
সাবিলার ঠোটে হাসি ফুটে উঠলো। সারাদিন ধরেই শুধু এই জিনিসটার অপেক্ষায় বসে ছিলো। রাশেদ কখনো এসব স্পেশাল দিন গুলো ভুলে না। স্পেশাল দিনের স্পেশাল গিফট গুলোর জন্য হলেও রাশেদের সাথে আজীবন থাকা যায়। ফুল বিক্রেতা রাকিব বাইরেই দাঁড়িয়ে আছে। জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে রাশেদ আর সাবিলা ঘরের ভেতর কেক কেটে তাদের বিবাহ বার্ষিকী উৎযাপন করছে। খানিক পরেই রাকিবের ডাক পরলো,
-- আচ্ছা তুমি এসেছো যখন এত কষ্ট করে, বিরিয়ানি খেয়ে যাও।
বিরিয়ানির কথা শুনে রাকিব আর না করতে পারে নি। দীর্ঘদিন ধরে খাওয়ার ইচ্ছে কিন্ত টাকার জন্য মিল করে খাওয়া হয়নি। ঘরের ভেতর ঢুকে রাকিব টেবিলে বসে পড়লো খাওয়ার জন্য। সবাইকে খাবার দেওয়ার পর নিজে খাবার টেবিলে বসে সাবিলা রাকিবকে প্রশ্ন করলো,
-- আচ্ছা তোমার বাসায় কে কে আছে?
রাকিব বললো,
-- আমার তো কেউই নেই আমি একলাই।
বলেই রাকিব খেতে শুরু করলো। সাবিলা আর রাশেদ খাওয়া বাদ দিয়ে অদ্ভুত ভঙ্গী তে রাকিবের দিকে তাকিয়ে আছে। দুজনের মুখেই মুচকি মুচকি হাসি। রাকিব খানিক অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
-- কিছু হইছে?
সাবিলা শান্ত ভাবে জিজ্ঞেস করলো,
-- আচ্ছা তুমি কি জানো রাশেদ আজকে কেন ২৫০ টা ফুলই নিলো? বেশি কিংবা কম না কেন?
রাকিবের ও মনে হলো আজকে বেশি ফুল দিতে চাওয়ার পরেও রাশেদ মানা করে দিয়েছে। ব্যাপারটা সেও বুঝে নি! রাকিব আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করলো,
-- ওইডা তো জানি না! নিলো না কেন?
সাবিলা মুচকি হেসে বললো,
-- আসলে আমাদের যততম বিবাহ বার্ষিকী ও আমাকে ঠিক ততটা ফুল দিয়ে উইশ করে! আর আজকে আমাদের ২৫০ তম বিবাহ বার্ষিকী।
রাকিবের মুখ দিয়ে খাবার খাওয়া বন্ধ হয়ে গেলো। রাকিব ভালো করে লক্ষ করে দেখলো সাবিলা আর রাশেদ দুজনের চোখই নীল বর্ণের। রাকিবের অবচেতন মন প্রচন্ড ভাবে তাড়া দিলো তাকে, এবার তার পালানো উচিত। এক মুহূর্তের ভেতর রাকিব পালানোর কথা ভেবে নিলো। কিন্ত সে অবাক হয়ে লক্ষ করলো হাত পা সে নাড়াতে পাড়ছে না, অবশ হয়ে আসছে হাত পা। বিরিয়ানিতে কিছু মেশানো ছিলো। দু চোখে ঝাপসা দেখছে সে। ঝাপসা ঝাপসা চোখে দেখলো হাস্যোজ্জ্বল চেহারা নিয়ে সাবিলা উঠে তার দিকে আসছে। এরপর এক খানিকের জন্য অনুভব করলো, তার ঘাড়ে কেউ দাত বসিয়ে দিয়েছে। প্রচন্ড যন্ত্রনায় চোখে বেরিয়ে আসার উপক্রম। এরপর অন্ধকার!
গল্পঃ বিবাহবার্ষিকী
লেখাঃ শাওন সিকদার
মন্তব্যসমূহ